কার্ল মার্কস: মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা

কার্ল মার্কস: মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৭ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৮:২৫

বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে রাজনৈতিক দর্শন সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছিলো তা মার্কসের দর্শন বা মার্কসবাদ বলে পরিচিত। পৃথিবীর বহু দেশে কমিউনিজম, সমাজতন্ত্র বা মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সমাজের মধ্যে মার্কসবাদই একমাত্র শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দর্শন বলে বিবেচিত হয়। মার্কসীয় দর্শনের জনক কার্ল মার্কসের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

কার্ল মার্কস ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবেত্তা, সমাজ বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী। সমগ্র মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন মার্ক্স। বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী দর্শনকে মার্কসবাদী দর্শন বলা হয়।

কার্ল মার্কস কে ছিলেন?
কার্ল মার্কস ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবেত্তা, সমাজ বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী। সমগ্র মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন মার্ক্স। মার্ক্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলোর মাঝে রয়েছে তিন খণ্ডে রচিত পুঁজি এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সাথে যৌথভাবে রচিত কমিউনিস্ট ইশতেহার (১৮৪৮)।

আর কোনো মতবাদই এভাবে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তবে নানা সীমাবদ্ধতা, সাম্রাজ্যবাদের অপপ্রচার, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারার অক্ষমতা, গণতন্ত্রহীনতা ইত্যাদি কারণে শ্রেষ্ঠ মতবাদ হয়েও সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ ইদানীং তরুণ প্রজন্মের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। মানুষ সাম্যের চেয়ে, স্বাধীনতায় বেশি উৎসাহী।

কার্ল মার্কসের জন্ম ও পরিবার
কার্ল মার্কস ১৮১৮ সনের ৫ই মে জার্মানীর ট্রয়ার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কার্ল মার্কসের পিতা একজন আইনজীবী ছিলেন। বাবা–মা প্রথম জীবনে ইহুদী ছিলেন। পরবর্তীতে তারা প্রোটেট্সট্যান্ট খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। কার্ল মার্কসের মধ্যে অবশ্য ধর্ম সম্বন্ধে তেমন আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। কে কোন ধর্মের লোক তাতে তার কিছু এসে যায় না। তিনি শুধু এইটুকু বলতেন, ‘ধর্ম মানুষের কাছে আফিম স্বরূপ, যা দিয়ে মানুষকে শুধু বিভ্রান্ত ও প্রতারিতই করা যায়।’
কার্ল মার্কসই প্রথম মানব যিনি সকল মানুষকে সর্বাগ্রে তার অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তোলেন। শ্রমজীবী একজন মানুষের তার শ্রমের বিনিময়ে কতটুকু পাওনা, তাকে সে সম্বন্ধে তিনিই প্রথম সজাগ সতর্ক করার প্রয়াস পান। পুঁজিবাদ কিভাবে মানুষকে শোষণ করে— তা তিনি বিশেষভাবে নির্দেশ করেন।

কার্ল মার্কসের শিক্ষাজীবন
বার্লিন, বন এবং জেনা বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে মার্কস আইন, দর্শন এবং ধর্ম সম্বন্ধে পড়াশুনা করেন। জেনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দর্শনে ডক্টরেট ডিগ্রী নেন। কার্ল মার্কসের বাবা চেয়েছিলেন পুত্র তার মতো আইন ব্যবসায়ী হবেন। কিন্তু মানবদরদী মানবতাবাদী মার্কস মানুষের চিরায়ত মঙ্গল করার জন্য এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের সূত্রপাত করেন। তিনি তার বৈপ্লবিক চিন্তাধারার জন্য প্রথমে জার্মানী থেকে পরে বেলজিয়াম, মতান্তরে ফ্রান্সে থেকে বহিষ্কৃত হন। তিনি শেষ পর্যন্ত স্ত্রী ও সন্তানসহ বাকি জীবনটা লন্ডনে কাটিয়ে দেন।

কার্ল মার্কসের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো
লন্ডনে বসবাসকালে বৃটিশ মিউজিয়ামের প্রায় সব পুস্তক তিনি পড়ে ফেলেন। এদিকে লন্ডন থেকে তার পরবর্তী সারা জীবনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বন্ধু এঙ্গেলস-এর সহযোগিতায় ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশ করেন কমিউনিষ্ট মেনিফেস্টো। এই মেনিফেস্টোর মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন বিশ্বে পুঁজিবাদের পতন এবং সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা অনিবার্যভাবে ঘটবে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ বর্তমান যুগের শ্রমজীবী মানুষের একটা অতিপ্রিয় বহুল প্রচলিত শ্লোগান মার্কস এবং এঙ্গেলস প্রচার করেন।

‘ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বিক বস্তুবাদ’ এই মতবাদের মাধ্যমে মার্কস মানুষের পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করে বলেছেন, মানুষের সমাজে প্রথম ছিলো আদিম সমাজব্যবস্থা, এরপর কায়েম হলো দাসব্যবস্থা, তারপর সামন্তবাদ, এরপরে পুঁজিবাদ— যার অনিবার্য ফলশ্রুতিতে কায়েম হবে সমাজতন্ত্র এবং তারপর কমিউনিজম বা সাম্যবাদে ঘটবে সভ্য মানুষের চরম ও পরম উত্তরণ।

কার্ল মার্কসের কর্মজীবন
১৯১৭ সালে প্রথমে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে মার্কস–এঙ্গেলসের পথে মহামতি লেনিন রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম করেন। তারপর মাও সে তুং চীনে শ্রমিক শ্রেণীর সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সাম্যবাদ কায়েম করেন। তারপর বিশ্বের বহু দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিগত এক দশকে রাশিয়াসহ বহুদেশে সমাজতন্ত্রের পতন হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট গর্বাচেভ সমাজতন্ত্রকে পরিত্যাগ করে দেশকে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক দেশে রূপান্তরিত করেন। চীন এখনো সমাজতান্ত্রিক দেশ। চীন সমাজতান্ত্রিক আদর্শ পরিত্যাগ করেনি। সমাজতন্ত্র পরিত্যাগকারী কিছু কিছু দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রীরা আবার ক্ষমতায় এসেছে। মার্কসের তত্ত্ব হল ইতিহাস দর্শন এবং বৈপ্লবিক পরিকল্পনার সংস্কারের তত্ত্ব। এই মতবাদের অন্তর্নিহিত ভিত্তি হল ডায়ালেকটিকাল বস্তুবাদ।

কার্ল মার্কস বলেছেন
১৮৪৮ খ্রিঃ কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে তিনি বলেছিলেন— (১) ভূসম্পত্তির যথাযথ বিলি এবং ওই ভূসম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব থেকেই রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহ। (২) প্রগতিশীল ও উচ্চ পর্যায়ের আয়কর ব্যবস্থা পরিবর্তন। (৩) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অধিকারের বিলোপ সাধন। (৪) একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঋণদান ব্যবস্থার কেন্দ্রীয়করণ। (৫) পরিবহন ব্যবস্থা জাতীয়করণ। (৬) ভূমির নতুন বিলি ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানার সংখ্যাবৃদ্ধি। (৭) কর্মক্ষম প্রতিটি ব্যক্তির চাকরি। (৮) রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সকল শিশুকে শিক্ষাদান এবং শিল্পকারখানায় শিল্প শ্রমিকের শ্রমের অবলুপ্তি।

এই ম্যানিফেস্টোতে বলা হয়েছিল, কমিউনিস্টদের বিশ্বাস, সমসাময়িক যাবতীয় সামাজিক বিধিব্যবস্থার মুলোৎপাটন ঘটিয়ে এই লক্ষ পূরণ করা সম্ভব এবং মুলোৎপাটনের পদ্ধতিটি সশস্ত্র ও সহিংস হতে হবে। মার্কস এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এঙ্গেলস ছিলেন এই ম্যানিফেস্টো সৃষ্টির মূল প্রবক্তা।

কার্ল মার্কসের মৃত্যু
কার্ল মার্কস ১৮৮৩ সনের ১৪ই মার্চ ৬৫ বছর বয়সে লন্ডনে পরলোকগমন করেন। লন্ডনের হাইগেট সমাধি ক্ষেত্রে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading