ঢাকা ছাড়ছে ১ কোটি মানুষ: নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রার প্রত্যাশা
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৮ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৫:৩০
করোনা ভাইরাস প্রকোপ কমে আসায় এবারের ঈদে গেল বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাবেন বলে আগেই ধারণা করেছিল বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ঈদ যাত্রার প্রথম দিনেই সেই রেশ টের পাওয়া গেলো বেশ। রেলপথে ইতোমধ্যেই ঈদ যাত্রা শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বাস-লঞ্চ-বিমানসহ বিভিন্ন পথে ঢাকা ছাড়বেন লাখো মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তির হবে বলা হয়েছে কিন্তু বাস্তবতা কী তা বলছে? বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২ কিংবা ৩ মে হতে পারে ঈদ-উল-ফিতর। তার আগে আজ বৃহস্পতিবার (২৮ এপ্রিল) থেকেই শুরু হবে ঈদযাত্রা, কেননা সাপ্তাহিক ছুটি আর মে দিবসের ছুটি এবার মিলে যাচ্ছে ঈদের ছুটির সঙ্গে। গত দুই বছরের করোনা মহামারির পর এবার অনেকটা স্বাভাবিক পরিবেশে ঈদ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর কারণেই এবার গ্রামের বাড়ি ঊদ করতে যাওয়ার হিড়িক বেড়েছে। আর তাইতো প্রায় এক কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বে বলে বিভিন্ন জরিপ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। এতো অধিক সংখ্যক মানুষ কিভাবে ঢাকা ছাড়বে, তাদের যাত্রাপথ কেমন হবে এরকম প্রশ্ন এখন সবার মনেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাস, লঞ্চ ও রেলস্টেশনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার।
ঈদে বাড়ি ফেরা আনন্দের না ভোগান্তির
ঈদে বাড়ি ফেরা আনন্দের উপলক্ষ হলেও প্রতিবছর পথের নানা ভোগান্তি এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণে তা কোনো কোনো পরিবারের জন্য যেভাবে নিরানন্দ বয়ে আনে, সেটি দুর্ভাগ্যজনক। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বস্তুত সুষ্ঠু যানবাহন ব্যবস্থাপনা, সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং বাড়তি আয়োজন গ্রহণের মাধ্যমে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসবকে সবার জন্যই আনন্দময় করে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলেছে, যানজট ও নানা অব্যবস্থাপনার কারণে গণপরিবহনে সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে এবারের ঈদযাত্রায় নারকীয় পরিস্থিতি হতে পারে। সেই সঙ্গে আসন্ন ঈদযাত্রায় অসহনীয় যানজট, পথে পথে যাত্রী হয়রানি, ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
‘ঢাকা ছাড়বে এক কোটিরও বেশি মানুষ’
তারা বলছে, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে ১ কোটির বেশি মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করবে। এছাড়াও এক জেলা থেকে অপর জেলায় আরও প্রায় ৫ কোটি মানুষ যাতায়াত করতে পারে। এতে আগামী ১০ মে পর্যন্ত ঈদবাজার, গ্রামের বাড়ি যাতায়াতসহ নানা কারণে দেশের বিভিন্ন শ্রেণির পরিববহনে বাড়তি প্রায় ৬০ কোটি ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন বাড়তি নিরাপত্তা, সর্বোচ্চ সতর্কতা, সকল পথের প্রতিটি যানবাহনের সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করা।
‘ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঈদুল ফিতর প্রায় সমাগত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) সকালে সচিবালয়ে তার দপ্তরে ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন তিনি। ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশের সড়ক-মহাসড়কসমূহ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক ভালো। সড়কের জন্য কোথাও যাতে কোনো জনদুর্ভোগ না হয় সেজন্য সতর্ক থাকার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ফ্লাইটের টিকিট বাড়তি দামে
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রুটের আসন্ন ঈদে আগে ও পরে ১০ দিনের বাংলাদেশ বিমানসহ বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর টিকিট বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে এবারের ঈদে যাত্রী সাধারণকে এসব ফ্লাইটে টিকিট কয়েকগুণ বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই সকল রুটের টিকিট অগ্রিম বিক্রি শেষ হয়ে গিয়েছে। যার ফলে ইচ্ছে থাকা সত্বেও অনেকেই টিকিট কিনতে পাচ্ছে না।
নৌপথে ৪০ লাখ মানুষের চাপ
ঈদ যাত্রায় ঢাকার সদরঘাটে ৪০ লাখ মানুষের চাপ থাকবে। এই চাপ সামাল দেয়ার মতো নৌযান না থাকায় ঈদ যাত্রায় মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি। তারা বলছে, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ এবং গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ মহানগরসহ এ তিন জেলার প্রায় ৪০ লাখ মানুষ নৌপথে উপকূলীয় জেলাগুলোতে যাবে। কিন্তু মাত্র ১২ দিনে একমুখী এত যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নৌযান না থাকায় এই চাপ সৃষ্টি হবে। ফলে লঞ্চের ডেকে অতিরিক্ত যাত্রীর পাশাপাশি ছাদেও যাত্রী বহন করা হবে।
আর এতেই বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হতে পারে। এদিকে, ঘরমুখো যাত্রীদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে পারাপার নিশ্চিতে শিমুলিয়া ঘাটে তিন শতাধিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন। পুলিশ সুপার জানান, তিন শতাধিক পুলিশ তিন শিফটে শিমুলিয়া ঘাটে ঈদের আগে এবং পরে দায়িত্বে থাকবে। পুলিশ কন্ট্রোল থাকবে। সে সঙ্গে সার্বক্ষণিক ঘাট এলাকার পর্যবেক্ষণ করে কোনও অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মহাসড়কে মহাসড়কে তীব্র যানজটের শঙ্কা
সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গত কয়েক মাস ধরে চলছে উন্নয়ন কাজ। বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ শেষ না হওয়ায় সড়কে যান চলাচলে রয়েছে ধীরগতি। এ অবস্থায় ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপে তীব্র যানজটের আশঙ্কা করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তবে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের দাবি, কিছুটা যানজট থাকলেও মানুষ নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারবেন। যানজট এড়ানোর জন্য সব ধরনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। কয়েক মাস ধরে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের চার লেনের কাজ চলছে। সাভার বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও ধামরাই এলাকায় এখনও অধিকাংশ কাজ শেষ করা হয়নি।
অন্যদিকে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে জিরাবো, জামগড়া ও ইউনিকসহ বেশ কিছু বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে তেমন কোনও সংস্কার কাজ না করায় সড়কের বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই সড়কে প্রায় প্রতিদিনই যানজট লেগে রয়েছে। গতবারের তুলনায় এবারের ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেশি থাকবে। মহাসড়কের বাসস্ট্যান্ড এলাকাগুলোতে ধীরগতিতে যাত্রী উঠানামা করাসহ বিভিন্ন কারণে সাভারে যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে বলে তিনি জানান।
গার্মেন্টে একযোগে ছুটিতে বাড়তি চাপ
দেশের ৪০ লাখের বেশি পোশাক শ্রমিকের অধিকাংশের কর্মস্থল ঢাকা এবং এর আশপাশের গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকা। আজ বৃহস্পতিবার পোশাক কারখানাগুলোতে একযোগে ছুটি হবে বলে সড়কে বাড়তি চাপে অব্যবস্থাপনা এবং যাত্রীদের ভোগান্তির শঙ্কা করছেন পরিবহন মালিকরা। সাভার, জয়দেবপুর, আশুলিয়া, চন্দ্রা এলাকার পোশাক শ্রমিকরা উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে ঈদের সময় যেতে দল বেঁধে বাস ভাড়া করেন। এসব বাসের অধিকাংশই রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় স্বল্প দূরত্বে চলাচলকারী।

শুরুর দিনে দেরিতে ছাড়ল ডজন খানেক ট্রেন
রেলওয়ের ঈদযাত্রা শুরুর দিনেই নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারেনি ডজন খানেক ট্রেন; ফলে দিনভর ভুগতে হয়েছে যাত্রীদের। এবার ঈদ উপলক্ষে বুধবার (২৭ এপ্রিল) এর টিকেট বিক্রির মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে ট্রেনের আগাম টিকেট বিক্রি শুরু হয়েছিল। সে অনুযায়ী, বুধবারকে ট্রেনের ঈদযাত্রা শুরুর দিন ধরা হচ্ছে। ঢাকা থেকে সারাদেশের বিভিন্ন গন্তব্যের সব ট্রেন কমলাপুর স্টেশন থেকে ছাড়ে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ডজন খানেক ট্রেনের যাত্রা শুরুতে দেরি দেখা গেলেও কোনোটির যাত্রা এক ঘণ্টার বেশি বিলম্বিত হয়নি। এদিন ভোর ৬টায় রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেন ছাড়ার মধ্য দিয়ে ঈদযাত্রা শুরুর কথা ছিল। প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে ছাড়ে ট্রেনটি। আর এর আগেই সকাল ৬টা ২০ মিনিটে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস স্টেশন চেড়ে যাওয়ায় সেটি হয়ে যায় ঈদযাত্রার প্রথম ট্রেন।
কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, সকাল থেকে যে ট্রেনগুলো ছেড়ে গেছে, এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের দিকে তিনটি ট্রেন একটু বিলম্বে ছেড়েছে। ট্রেনগুলোর লাইন জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত, সবগুলো সিঙ্গেল লাইন। সেখানে যতগুলো স্টেশন আছে, একটা স্টেশন থেকে আরেকটা স্টেশনের দূরত্ব অনেক বেশি। যার কারণে ক্রসিং এবং ডিফারেন্সের কারণে যে অ্যারেঞ্জমেন্টগুলো, সেগুলো একটু দেরি। মাসুদ বলেন, পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোর শিডিউল বিপর্যয় হতে পারে। এটা আমাদের মেনে নিয়েই কাজ করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত ডাবল লাইন না হবে ততদিন এই সমস্যাটা থাকবে। আশার কথা হলো, রেল মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ডাবল লাইন করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পূর্বাঞ্চলে শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা নেই দাবি করে তিনি বলেন, পূর্বাঞ্চলে যে ট্রেনগুলো রয়েছে, সেগুলো যথাসময়ে ছাড়তে পারব আশা করি।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বুধবার কমলাপুর স্টেশনে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ভ্রাম্যমাণ রেল জাদুঘর ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সংগৃহীত ৩০টি মিটার গেজ ও ১৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য। তিনি অতিরিক্ত ট্রেন না চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল ও রেলওয়ে সিঙ্গেল লাইনকে কারণ হিসাবে দেখান। সুজন বলেন, আমাদের বেশির ভাগ রেলওয়ে লাইন সিঙ্গেল লাইন। এ কারণে আমরা বেশি সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা করতে পারি না। কারণ একই ট্রেনে আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে যে কোনো স্টেশনে আরেকটি ট্রেনকে পাসিং দিতে হয়।
মন্ত্রী দাবি করেন, রেলের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। তিনি বলেন, রেল এখন মানুষের আশা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই ঈদেও সেটা দেখা গিয়েছে। এবার ঈদে মানুষ রেল কে প্রথম বাহন হিসেবে পছন্দ করেছে। যে কারণে রেলের প্রতি এতদিন মানুষ যে আগ্রহবিমুখ ছিল, তা আবার ফিরে এসেছে।
ইউডি/অনিক

