সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অর্জন বেড়েছে বাংলাদেশের

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অর্জন বেড়েছে বাংলাদেশের

অনিক সরকার । শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:২০

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের মূল ব্যবহৃত কাঠামো হিসেবে কাজ করবে একটি জীবনচক্রভিত্তিক ব্যবস্থা। একজন মানুষের জন্মের পূর্ব থেকে (গর্ভাবস্থায়) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সস্তরের অর্থাত্ জীবনচক্রের পাঁচটি মূল স্তরের (গর্ভধারণ ও প্রাক শৈশবকাল, বিদ্যালয় গমনের বয়স, কর্মজীবনে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে থাকা তরুণ, কর্মোপযোগী বয়স ও বৃদ্ধ বয়স) ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা ও ঝুঁকির দিকে লক্ষ্য রেখে প্রণীত হয় এ কৌশলপত্র। এছাড়া অনুষঙ্গ ঝুঁকি যা যেকোনো বয়সের যে-কারোর ওপর অভিঘাত সৃষ্টি করতে সক্ষম সে সবের জন্যও থাকবে বিশেষ কর্মসূচি (যেমন—প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা)। বিশেষ কর্মসূচি থাকবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর জন্যও।

মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময় এবং জন্ম-পরবর্তী প্রথম ২৪ মাস শিশুর ভবিষ্যত্ বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। এসময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টির সংস্থান না পেলে জীবনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য তা বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়ায়। শিশুদের জীবনে একটি সুন্দর সূচনা এনে দেবার জন্য সরকার ০-৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ‘শিশু কল্যাণ কর্মসূচি’ নামে একটি যুগান্তকারী পরিকল্পের প্রস্তাবনা নিয়ে এসেছে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের মাধ্যমে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই এ কর্মসূচির একটি সময়ভিত্তিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। নগদ অর্থ সহায়তার পরিমাণ ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রাথমিকভাবে ৮৫০ টাকা করা হচ্ছে (যা ২,৩১৮ কিলোক্যালোরি খাদ্য সমতুল্য)। দেশের সকল দরিদ্র মা সর্বাধিক প্রথম দুই সন্তানের (উচ্চ প্রজনন হার নিরুত্সাহিত করার লক্ষ্যে) ক্ষেত্রে এ সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ভাতা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের জন্য ভাতা পাচ্ছেন যথাক্রমে ৭ লাখ ও ২.৫ লাখ নারী। পরিপূরক কর্মকাণ্ডের মধ্যে থাকছে গর্ভকালীন সময়ে ৪টি এএনসি ভিজিট (অ্যান্টিন্যাটাল কেয়ার), ০-২৪ মাসে ৪টি পিএনসি ভিজিট (পোস্টন্যাটাল কেয়ার) ও জন্ম নিবন্ধন, মায়েদের জন্য পুষ্টি শিক্ষা এবং ৪৮ মাস পূর্ণ হলে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সূচনার সমর্থনে।

বিদ্যালয়গামী শিশুদের জন্য জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের প্রস্তাবনা হচ্ছে জেন্ডার বৈষম্য না করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অতি দরিদ্র শিশুদের ৫০ শতাংশকে উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা। নগদ অর্থ সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে সময়োপযোগী করা এবং একের অধিক শিশু রয়েছে এমন পরিবারের ক্ষেত্রে ভাতার পরিমাণ না কমানো। অবশ্য পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ দুজন শিশু এ উপবৃত্তি সুবিধা লাভ করবে। সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটে ইতোমধ্যেই এ প্রস্তাবনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে বয়স্কদের জন্য তিন স্তরবিশিষ্ট পেনশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা রয়েছে। প্রথম স্তরটি হবে সরকার অর্থায়িত সুবিধা যা দরিদ্র ও ঝুঁকিগ্রস্ত সকল বয়স্ক নাগরিকের ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করবে; চলমান বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির সম্প্রসারণের মাধ্যমে এটি একটি বুনিয়াদী স্তর প্রতিষ্ঠা করবে। নারী ও পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন বয়সসীমার অবসান ঘটিয়ে দেশের সকল ষাটোর্ধ্ব নাগরিক (যাদের আয় উচ্চ দারিদ্র্য রেখার ১.২৫ গুণের মধ্যে) এ ভাতা প্রাপ্য হবেন। ভাতার পরিমাণ চলতি মূল্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হবে। এছাড়া ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ভাতার পরিমাণ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে কৌশলে। গত তিন বছরে উপকারভোগীর সংখ্যা গড়ে ৫ লাখ জন করে বেড়ে বর্তমানে ৪০ লাখে দাঁড়িয়েছে। নারী, পুরুষ নির্বিশেষে ষাটোর্ধ্ব সকলের জন্য প্রস্তাব প্রণয়নাধীন রয়েছে এবং নবতিপর বৃদ্ধদের জন্য মাসিক ভাতার পরিমাণ প্রস্তাব করা হয়েছে ৩০০০ টাকা। দ্বিতীয় স্তরটি হবে বেসরকারি আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত কর্মীদের জন্য অংশগ্রহণমূলক পেনশন কর্মসূচি যা ‘জাতীয় সামাজিক বীমা স্কিম’ নামে অভিহিত হবে।

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের আরেকটি প্রধান সংস্কার প্রস্তাবনা ছিল সরকার থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের সরাসরি ভাতা প্রদান ব্যবস্থা (জি২পি পেমেন্ট সিস্টেম) জোরদার করা। এ ধরনের ব্যবস্থা কেবল আর্থিক অন্তর্ভুক্তিই নিশ্চিত করবে না, রোধ করবে অপচয় ও দ্বৈততা। কৌশলপত্রে বলা হয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা কার্যক্রম সম্পাদন করবে। এ পর্যালোচনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে প্রধান প্রধান ভাতা প্রদানকারী মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একটি পরিকল্পনা প্রণীত হবে যেখানে জি২পি পেমেন্ট ব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রসারের রূপরেখা থাকবে। এর ফলে কোনোরকম ঝামেলা ও খরচ ছাড়াই সময়মত ও নিয়মিতভাবে ভাতা গ্রহীতারা নিজেদের দোরগোড়ায় পেয়ে যাচ্ছেন তাদের লভ্য সুবিধা। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে একটি শক্তিশালী অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে; যাতে করে বঞ্চিতরা তাদের বঞ্চনার কথা জানাতে পারে।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল। বিশেষ করে মানুষের স্থায়ী সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজর রয়েছে সরকারের। তাই আগামী বাজেটে শুধু সামাজিক নিরাপত্তা খাতেই ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। বিগত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনায় এগোচ্ছে সরকার। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের স্বপ্নপূরণের টার্গেট রয়েছে সরকারের সামনে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম বেগবান করতে উন্নত দেশের রোল মডেল অনুসরণ করবে বাংলাদেশ।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading