পর্নোগ্রাফির নেশা থেকে সন্তানকে রক্ষা করুন
সুপ্রিয়া দেবনাথ । রবিবার, ০১ মে ২০২২ । আপডেট ১৭:১৭
পর্নোগ্রাফি ভয়াবহ একটি স্লো-পয়জন যা আপনাকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষকরা জানান, মানুষ যখন পর্নোগ্রাফি দেখে তখন মস্তিষ্কের অন্যতম পরিবাহক ( নিউরোট্রান্সমিটার) ডোপামিনে একটি ঢেউ তুলে। এই পরিবাহকটির গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আনন্দ ও সুখের অনুভূতিগুলো বহন করে তার স্মৃতিগুলো নিউরনে পাঠিয়ে দেয়। একটা সময় মানুষ পর্নোগ্রাফির দেখার অভ্যাস ছাড়তে চাইলেও মস্তিষ্ক অভ্যস্ততা থেকে একই রকম ঢেউ চায়, পর্নোগ্রাফি দেখতে আসক্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি মানুষ বাস্তব জীবনেও যৌনক্রিয়া থেকে আগ্রহও হারিয়ে ফেলে।
নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দর্শকদের মস্তিষ্কের একটি অংশ স্টেরিয়াটামের আকৃতি ও কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। মস্তিষ্কের এই অংশটি উদ্দীপনা গ্রহন ও সুখানুভূতির সাথে সম্পৃক্ত। বিশ্বব্যাপী যৌনসন্ত্রাস বৃদ্ধির ঘটনাকে পর্নোগ্রাফি ও অশলীলতা চর্চার ফল হিসেবে দেখিয়েছেন গবেষকরা। পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে মস্তিষ্ক যখন নিয়মিত মানসিক পরিস্থিতি উন্নয়নের হরমোন নিঃসরণ করতে থাকে, মস্তিষ্ক তখন এই নেশায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। পর্ন দেখার চূড়ান্ত পরিণতি হলো এটা আপনার পুরো যৌনজীবনকে আপনারই অজান্তে একটু একটু করে নষ্ট করে দিচ্ছে, আপনার পক্ষে বিন্দু পরিমান উপলব্ধি করাও সম্ভব হচ্ছে না। যখন উপলুদ্ধি করতে পারবেন তখন আর কিছুই করার থাকে না। চোর চুরি করে পালানোর পর বুদ্ধি করলে কী চুরি হওয়া জিনিস ফিরিয়ে আনা যায়? যায় না, তেমনি অমূল্য সম্পদ যৌবন একবার ধ্বংস হয়ে গেলে তা আর ফিরে আসেনা।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৫৫ সালে পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতাকে সভ্যতার কালো দাগ হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন। রয়েল সোসাইটিতে দেয়া তিনি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, একদিন অশ্লীলতা চর্চার মাশুল গুনতে হবে মানবজাতিকে’। যেমনটা আজকের সমাজে আমরা উপলুদ্ধি করতে পারি যে কীভাবে পর্নোগ্রাফির ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যুব সমাজ অকালেই যৌবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যার ফলে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ এবং ঘটেই চলেছে একের পর এক পরকীয়ার মতো জগন্য ঘটনা।
আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে প্রযুক্তির হাতছানি। জীবনের এই দুই বিষয় কেবল বড়দের নয়, প্রভাবিত করে ছোটদেরও। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে নানা অ্যাপ- ইন্টারনেটের আশীর্বাদে আমাদের বেঁচে থাকাকে অনেক রঙচঙে ও সহজ-সামাজিক করে তুলছে বটে, কিন্তু এ সবের হাত ধরেই আবার শিশু বা কিশোর বয়স পৌঁছে যাচ্ছে পর্ন সাইটের দিকেও। নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ক্রমশ শিকার হচ্ছে তার। কেউ বা সরাসরি অংশ নিচ্ছে চাইল্ড পর্নোগ্রাফিতে। আপনার সন্তানও এমন কোনও অভ্যাসের শিকার হয়ে পড়েনি তো? তবে মনে রাখবেন, অকারণ ভয় পেয়ে বা শাসন করে কিন্তু এই অভ্যাস তাড়ানোর নয়। তার চেয়ে কিছু কৌশল অবলম্বন করে এ সবের থেকে দূরে রাখুন সন্তানকে।
বরাবরই তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখুন, অভিভাবকদের মধ্যে অন্তত কেউ একজন এতটাই সহজ হয়ে মিশুন, যাতে বাইরে থেকে কিছু শুনে এলে বা বন্ধুদের থেকে কিছু জানলে তা সে জানাতে পারে আপনাদের।
পর্নোগ্রাফি কী, এই নেশা কেন ক্ষতি করতে পারে, কেনই বা পর্নোগ্রাফিতে শিশুদের অংশ নেওয়া সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ- এ সব কথা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর থেকেই গল্পের ছলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। আপনার আড়ালে সে এমন কোনও নেশার কবলে পড়ছে কি-না, তা জানাও খুব জরুরি। গুগলে ‘চাইন্ড পর্নোগ্রাফি’ টাইপ করলে, নিষিদ্ধ এই বিষয়ের প্রতি সচেতন করে গুগল। তাই সন্তান যে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করে, তার দিকেও খেয়াল রাখাও অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব। আজকাল বেশ কিছু মোবাইল সেট ও অ্যাপের প্রি-ইনস্টল ফিল্টার থাকে। এর মাধ্যমে নজরদারি চালানো যায় মোবাইলে।
ল্যাপটপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করলে সবাই জানেন, এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। সন্তান আলাদা কোনও পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখতে চাইলে সচেতন হোন। তার ব্যক্তিগত বোধকে সম্মান দেখাতে গিয়ে অনেক সময় তাদেরই ক্ষতি করে ফেলি আমরা। মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহারের সময়ও যাতে খুব একটা গোপনীয়তা তারা অবলম্বন করতে না পারে, সে দিকে খেয়াল রাখুন। নজরদারি চালান, তবে তাকে অবিশ্বাস করছেন তা বুঝতে দেবেন না। বরং তার পাশের সঙ্গী, বন্ধু ও মেলামেশার পরিসরের সবাই কমবেশি চিনে রাখুন। কাউকে ক্ষতিকারক মনে হলে, তার সম্পর্কে সচেতন করুন সন্তানকে। প্রয়োজনে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ান। এছাড়া সন্তানের মুখে হঠাৎই কোনও খারাপ শব্দ শুনলে তাহলে কোথা থেকে শিখল তা জানতে চান, শাসন নয়, বন্ধুত্বই এই কৌশলের অন্যতম চাবিকাঠি।
এছাড়া নিজেরাও সন্তানের সামনে পর্ন ছবি বা ভিডিও নিয়ে আগ্রহ দেখানো বা আলোচনার বিষয় থেকে দূরে থাকুন। তবে কোনওভাবে সন্তান এই নেশার কবলে পড়েছে বুঝতে পারলে আর দেরি করবেন না। দ্রæত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। আসল করথা হলো ইচ্ছে থাকলে এসব থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। নিজের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করতে হলে এসব থেকে নিজেকে মুক্ত হতে হবে।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সিফাত

