দারিদ্র্য বিমোচনে মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প নেই
ওসমান হায়দার । রবিবার, ০১ মে ২০২২ । আপডেট ১৭:৪৭
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তাদের দেওয়া পরিসংখ্যানে উল্লেখ করেছিল, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। পরের বছর তা ২৭ লাখে উন্নীত হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারের যে পরিসংখ্যান নির্ধারণ করে তা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু উন্নত বিশ্বের বেকারের স্বরূপ আর বাংলাদেশের বেকারের স্বরূপ একই রকম নয়। কাজেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ বিভিন্ন সময় যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪ কোটিরও বেশি। বেকারের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি বা মতভেদ থাকতে পারে কিন্তু দেশের কর্মক্ষম লোকবলের একটি বিরাট অংশই যে বেকার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনাকালে দেশে বেকারের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোনো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতে, করোনার কারণে অন্তত ৩ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। এদের অধিকাংশই কর্মচ্যুত বা পেশাচ্যুত হয়েছেন। অনেকে চাকরিতে বহাল থাকলেও তাদের বেতন-ভাতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর সামাজিক সুরক্ষাবলয় আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। উন্নত দেশগুলোতে বেকারদের নিয়মিত ভাতা প্রদান করা হয়। তাদের দেশে বেকারের সংজ্ঞা আর আমাদের দেশের বেকারের সংজ্ঞা একই রকম নয়। কাজেই বাংলাদেশের বেকারের সংখ্যা এবং হার নির্ণয় করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনীতির পরিভাষায় পূর্ণাঙ্গ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থান বলতে এমন অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি তার স্ট্যাটাস বজায় রেখে চার-পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের ভরণ-পোষণ এবং অন্যান্য আবশ্যিক ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ উপার্জন করতে পারেন।
একজন মানুষ যদি তার উপযুক্ততা অনুযায়ী কর্মসংস্থান করতে না পারেন তাহলে তাকেও এক ধরনের বেকারত্ব বলা যেতে পারে। যেমন, কোনো একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে পেশাগত দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্হা করতে না পেরে একটি মুদি দোকানের ম্যানেজার হিসেবে চাকরি গ্রহণ করেন, তাহলে তাকে কোনোভাবেই উপযুক্ত এবং পূর্ণ কর্মসংস্থান বলা যাবে না। আবার কেউ যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে তার পেশাগত দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি পান কিন্তু তাকে যে বেতন-ভাতা দেওয়া হয় তার পরিমাণ খুবই কম, তাহলে তাকে কোনোভাবেই পূর্ণ কর্মসংস্থান বলা যাবে না। অর্থনীতির পরিভাষায় ছদ্ম বেকার, মৌসুমি বেকার, আন্ডার এমপ্লয়মেন্টের আলাদা আলাদা সংজ্ঞা দেওয়া আছে। বেকারত্বের সঙ্গে দারিদ্রের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কোনো বেকার মানুষের পক্ষে তার পরিবারের দারিদ্র্য বিমোচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার যে ব্যক্তিটি উপযুক্ত এবং পূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন তার পরিবার সাধারণত দরিদ্র থাকে না। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে, সবার জন্য উপযুক্ততা অনুযায়ী পূর্ণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশে স্বল্পশিক্ষিতদের চেয়ে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা বেশি। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রতি তিন জনের মধ্যে অন্তত এক জন বেকার। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মসংস্থানমূলক নয়। বরং বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন ব্যক্তিকে আত্ম অহমিকাপূর্ণ বেকারে পরিণত করে। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিটি ইচ্ছে করলেই সাধারণ কোনো কাজ করতে চান না। কারণ, শিক্ষাব্যবস্থা তাদের তেমনভাবে বিকশিত করেনি। শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর আত্মস্থ সৃজনশীল শক্তিকে বিকশিত করে তাতে একটি কাজের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও তেমনটি নয়।
আমাদের দেশের আগের শিক্ষাব্যবস্থাই বরং তুলনামূলক ভালো মানের ছিল। অনেকেই মনে করেন, বর্তমানে শিক্ষার্থী এবং ভালো রেজাল্ট করে পাশ করার হার আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমরা শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারিনি। দেশে বর্তমানে যেভাবে উচ্চশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে সেখানেও পরিবর্তন সাধন করা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী এবং কারিগরিভিত্তিক নয়। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ দীর্ঘ দিন বেকার থাকতে পারেন না। কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেলে তিনি অন্তত আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/সিফাত

