বাঙালির চিন্তা চেতনায় অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ রবীন্দ্রনাথ
আলতাফ সিকান্দার । মঙ্গলবার, ১০ মে ২০২২ । আপডেট ১১:৩০
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তার প্রিয় সোনার বাংলা, স্রষ্টা আর সৃষ্টির অনাবিল চেতনার এক বৈচিত্র্যময় রূপকল্প। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সাহিত্যকর্মের উৎস ও প্রেরণাস্থল এই সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ। এ দেশের তৃণমূল মানুষ, নদী ও নদীতীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার চিন্তা ও মননে যে নান্দনিক ভাব ও ভাষাশিল্প সৃষ্টি করেছিল, সেটাই আজ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির গৌরবময় অর্জন। বাংলাদেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে, নিসর্গে রবীন্দ্রনাথ তাই মিশে আছেন অকৃত্রিম আত্মিক বন্ধনে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের এক বর্ধিষ্ণু এলাকা খুলনা জেলার রূপসা থানার পিঠাভোগেই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসবাস। কবির পূর্বপুরুষের উপাধি ছিল কুশারী, যারা ছিলেন নিচু বংশীয় ব্রাহ্মণ। পরবর্তীকালে তাদের পরিবারের অধিকাংশ কলকাতায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। কলকাতার জোড়াসাঁকোয় ১৮৬১ সালের ৭ মে কবি জন্মগ্রহণ করেন। কবির পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের সারদা দেবীকে। ১৮৮৩ সালে কবির মামাবাড়ির দিঘির অপর পাড়ের বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এভাবে আত্মীয়তার নিগূঢ় বন্ধনে কবি আবদ্ধ ছিলেন বাংলাদেশের সঙ্গে।
বাংলাদেশে ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ছিল নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পতিসর, কুষ্টিয়ার শিলাইদহ এবং পাবনার সাহজাদপুরে। ১৯২০ সালে পারিবারিক জমিদারি ভাগের পর পতিসর কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগে পড়ে। সেজন্য পতিসরকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ তৈরি করেন আদর্শগ্রাম, রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, চিকিৎসালয়, রেশম চাষ প্রকল্প ও কৃষি ব্যাংকসহ বিভিন্ন জনহিতকর প্রতিষ্ঠান। এমনকি ১৯১৩ সালে বাংলা সাহিত্যে এশিয়া মহাদেশের প্রথম নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ তার প্রাপ্য ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা পতিসর কৃষি ব্যাংককেই প্রদান করেন।
কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার থেকে পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি কাজের দেখাশোনা করতে বাংলাদেশে আসেন। এ সময় শিলাইদহের কুঠিবাড়ি থেকে পদ্মা, ইছামতি, করতোয়া, বড়াল, আত্রাই, চলনবিল আর পতিসরের নাগর নদীতে কবি বোটে বসে বাংলার নদীতীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেন, যা কবিকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল তার দুর্লভ সাহিত্য সৃষ্টিতে। কবির অনন্য সৃষ্টি সোনার তরী, বৈতালী প্রভৃতি কবিতা ও বিসর্জন নাটক নদীমাতৃক বাংলাদেশের বহমান নদীর বুকে বসেই লেখা। বাংলাদেশের মানুষের হাজার বছরের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ ও আবেগের মরমি সুর, কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি জারি, সারি গানের বৈচিত্র্যময় সম্মিলন ঘটেছে রবীন্দ্র সুর ও সংগীতে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই শিশু বয়সেই মায়ের কোলে ও হাত ধরে বাংলাদেশে আসতেন বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানের সুবাদে। দাম্পত্য জীবনে বাংলাদেশেই কেটেছে কবির আবেগময় অনেক দুর্লভ মুহূর্ত। বিশ শতকের প্রথম থেকেই সুদূর রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া অবধি ছিল কবির অবাধ বিচরণ। ১৮৯৮ সালে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দিতে কবি ঢাকা এসেছিলেন। ১৯০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে খুলনার মহকুমা হাকিম আদালতে এসেছিলেন মামলার সাক্ষ্য দিতে। ১৯২৬ সালে কবি আবার ঢাকায় আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে। করোনেশন পার্ক, নর্থব্রক হল, কার্জন হলে কবি নানা বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য রাখেন। অবশেষে ময়মনসিংহ ঘুরে কবি রওনা হন শান্তিনিকেতনে। কবির জীবদ্দশায় বাংলাদেশে এই ছিল তার শেষ পদচারণা।
বাঙালির চিন্তা, চেতনায় ও মননে রবীন্দ্রনাথ এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছেন। বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নৃত্যনাট্য, কাব্যনাট্য, সংগীত, চিত্রকলা প্রভৃতির উপস্থিতি বাঙালির ধমনিতে রক্তপ্রবাহের মতো। রবীন্দ্রনাথ আমাদের আত্মার আত্মীয়, আমাদের জাতীয় গর্বের ধন, বাঙালির অহংকার। তাই তো রবীন্দ্রনাথের অন্তরাত্মা নিঃসৃত বাণী দিয়েই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের মাঙ্গলিক শোভাযাত্রা, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত
বাংলাদেশের প্রকৃতি, বাঙালির প্রেম, পূজা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের স্বাদেশিকতায় রবীন্দ্র ভাব, বাণী ও সুর আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে জীবনের জাগরণে, বর্ধনে ও সফলতার শীর্ষে আরোহণের অগ্নিমন্ত্রে। সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একজন ব্যক্তিমাত্র নন, একটি জাতির সমগ্র জীবনের অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা। আজ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬২তম জন্মতিথি। তার মতো মহাপুরুষ আমাদের মধ্যে জন্মগ্রহণ করে আমাদের ধন্য করেছেন। আমাদের মধ্যে রবি কিরণ কখনো ফুরাবার নয়।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

