শ্রমিক কল্যাণে অনন্য ভূমিকা রাখছে শ্রম অধিদফতর

শ্রমিক কল্যাণে অনন্য ভূমিকা রাখছে শ্রম অধিদফতর

মো. আকতারুল ইসলাম । মঙ্গলবার, ১০ মে ২০২২ । আপডেট ১১:৫০

জ্ঞানীর জ্ঞান, বিজ্ঞানের অত্যাশ্চার্য আবিষ্কার, ধর্ম সাধকের আত্মোপলব্ধি, ধনীর ধন, যোদ্ধার যুদ্ধে জয়লাভ সবকিছুই শ্রমলব্ধ। মানুষ জীবনধারণের জন্য যেসব কাজ করে থাকে তাকে শ্রম বলে। শ্রমিকই হলো সকল উন্নয়ন ও উৎপাদনের চাবিকাঠি। শ্রমের চাহিদা চিরন্তন নিরলস শ্রম দিয়েই এই সভ্যতা তৈরি। শ্রমের মূল্য অপরিসীম। কিন্তু এ সমাজে যারা শ্রম দেয় তারা কি যথাযথভাবে সে মূল্য পায়? এ প্রশ্ন চিরন্তন। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই শ্রমজীবীর বঞ্চিত হওয়ার দুর্ভাগ্য লক্ষ করা গেছে। শ্রমজীবীর যথাযথ প্রাপ্যতা এবং অধিকার নিশ্চিতে এ উপমহাদেশে বৃটিশ শাসন আমলেই শ্রমদফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বৃটেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে হাজার বছর ধরে চলে আসা লোমহর্ষক এবং নিকৃষ্টতম নির্যাতন কৃতদাস প্রথার দগদগে ক্ষত, ১৮৮৬ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে দৈনিক আটঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকদের আত্মত্যাগ, ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের উন্নতি, তাদের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী ১৯১৯ সালের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও গঠিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে ভারত উপমহাদেশে তেমন কোন শ্রম অসন্তোষ না থাকলেও বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে শ্রম সম্পর্কিত সুসম্পর্ক রক্ষা, শ্রম অধিকার এবং শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে ভারত সরকার প্রাথমিকভাবে ১৯২০ সালে লেবার ব্যুরো গঠন করে, যা আজ শ্রম অধিদফতর হিসেবে পূর্ণতা পেয়েছে। এক’শ বছর পেরিয়ে এ অধিদফতর আজ শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের আশ্রয়স্থল, আস্থার জায়গা।

বৃটিশ শাসনামলের মাঝামাঝি সময়ে অবিভক্ত ভারতে শুধু শ্রমিকের কল্যাণার্থে শ্রম প্রশাসনের সূত্রপাত ঘটে। লেবার ব্যুরো থেকে ১৯৩১ সালে জেনারেল ডিপার্টমেন্ট অভ লেবার নামকরণ করা হয়। ১৯৩৫ সালে নতুন সংবিধানের আওতায় লেবার ডিপার্টমেন্টের সৃষ্টি ও শ্রম প্রশাসনের বিকাশ ঘটে। শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রম কল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ড, শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ, স্বাস্থ্য বীমা, বার্ধক্যজনিত অবসর, ট্রেড ইউনিয়ন এসকল বিষয়গুলো শ্রম আইন প্রাদেশিক সরকারের অধিভুক্ত হয়। শিল্প শ্রমিক ও মহিলাদের মধ্যে দুরত্ব কমাতে ভারত সরকার ১৯৪১ এবং ৪২ সালে শ্রমিক-মালিক প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে মালিক-শ্রমিক ও সরকারি প্রতিনিধিত্বের মাধম্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সে অনুযায়ী ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক শ্রম মন্ত্রীদের কনফারেন্সে শ্রম ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্যে শ্রম আইন কেন্দ্রীয় সরকারের অধিভুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ১৯৬২ সাল পর্যন্ত শ্রম প্রশাসন কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে পরিগণিত ছিল। ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী তা প্রাদেশিক বিষয়ে রূপান্তরিত হয় এবং লেবার কমিশনারের পদসহ তাঁর দফতর সৃষ্টি করা হয়। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শ্রমনীতি এবং এয়ারভাইস মার্শাল নূর খানের রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে লেবার এন্ড সোস্যাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্টকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। এই তিনভাগে ছিল শ্রম সম্পর্ক পরিদফতর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদফতর এবং ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্টারের অফিস। পরবর্তীতে ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্টারকে শ্রম পরিদফতরের সাথে একত্রিকরণ করা হয়। সব শেষ বর্তমান সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১৭ সালে শ্রম পরিদফতরকে ‘শ্রম অধিদফতর’ করা হয়। সরকারের নানামুখি ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলে এ অধিদফতরের সক্ষমতা বেড়েছে বহুগুণ।

বৃটিশ ভারতের লেবার ব্যুরো শতবছর পেরিয়ে আজ পূর্ণাঙ্গ অবয়বে শ্রম অধিদফতর। বেড়েছে কলেবর, কর্মপরিধি, গায়ে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। অধিদফতরটি পেয়েছে রাজধানীর বিজয় স্মরণীতে সুউচ্চ শ্রম ভবন। এ অধিদফতরের আগামী কয়েক বছরের পরিকল্পনায় রয়েছে গাজীপুরের টঙ্গীতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় শ্রম ইনস্টিটিউট, মতিঝিলে লেবার ওয়েলফেয়ার টাওয়ার, তেজগাঁওয়ে ন্যাশনাল লেবার হাসপাতাল, দেশের বিভিন্ন জেলায় শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে পিছিয়ে পড়া যুবসমাজকে দক্ষ শ্রমিকে রূপান্তর প্রকল্প। পরিকল্পনায় নেয়া এসকল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শ্রম অধিদফতরের সেবার বদৌলতে শ্রমজীবী মানুষ সমাজের অন্যদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের পর্যায়ে নিতে বড়ো অবদান রাখতে পারবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading