সাইবার অপরাধ: অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হোন

সাইবার অপরাধ: অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হোন
দৈনিক উত্তরদক্ষিণ

নাজমুল কবির । মঙ্গলবার, ১০ মে ২০২২ । আপডেট ১১:২০

সাইবার অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। কেড়ে নিচ্ছে মানুষের শান্তি। প্রতিদিনই ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। আর্থিক প্রতারণা ও মানব পাচারের মতো জঘন্য কাজেও জড়িত সাইবার অপরাধীরা। সাইবার অপরাধ মাত্রাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে দায়ী কর্তৃপক্ষীয় অমনোযোগিতা। বিটিআরসির তথ্যমতে, এখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার। আর মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। অন্যের নামে নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত সিমের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে বড় বড় সাইবার অপরাধ।

সাইবার অপরাধীরা ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে অন্যের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করছে। সাইবার বুলিং, অনাকাক্সিক্ষত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধের ঘটনাও ঘটাচ্ছে। নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন নেটিজেনরা। ওটিটি কিংবা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটার, ভাইবার, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ইত্যাদির মাধ্যমে অনেকেই সাইবার অপরাধীদের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। এসব ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরমে কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে, ভয় দেখানো বা মানসিক নির্যাতন বা অন্যায় কোনো কিছুতে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।

কিশোর-কিশোরীরাই প্রথম দিকে এ ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছিল ব্যাপকভাবে। এখন বিভিন্ন বয়সীরা এ ফাঁদে পা দিচ্ছেন। বিশেষত নারীরাই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন বেশি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাই সাইবার অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। ভুক্তভোগী নারীদের ৪৯ শতাংশই স্কুলপড়ুয়া ছাত্রী। ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে যেহেতু সাইবার অপরাধ করা হয় সেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে দুনিয়াজুড়ে সুনামের অধিকারী হলেও তাতে ব্যত্যয় ঘটছে কয়েকটি সহিংস ঘটনায়। যেগুলোর পেছনে সাইবার অপরাধীদের হাত ছিল প্রত্যক্ষ। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সাইবার অপরাধ রুখতে সক্রিয় হতে হবে। এ ক্ষেত্রের সব ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে।

এ কথা পরিষ্কার যে, ভুক্তভোগীদের বিরাট অংশ বিভিন্ন কারণে আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন না এবং এই আইনের আশ্রয় না নেয়ার কারণে অপরাধী বারবার একই অপরাধ করার সাহস পেয়ে যাচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সমাজে বেড়ে যাচ্ছে সাইবার অপরাধ। এখন সময় এসেছে এই সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়ার। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যে বিষয়টিতে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা উচিৎ তা হচ্ছে, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। জনসচেতনতা তৈরির কাজে রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি সবার দায় আছে। ব্যক্তিকে যেমন তার পারিবারিক পর্যায় থেকে জনসচেতনতা তৈরির কাজ করতে হবে, পরিবারের কেউ ভুক্তভোগী হলে তার পাশে থেকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে তার ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করে যেতে হবে ঠিক তেমনি রাষ্ট্রকে ব্যাপক আকারে এই সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে মনোনিবেশ করতে হবে।

এইবার আসা যাক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেটি হচ্ছে এই অপরাধ যারা মোকাবিলা করবে তাদের সক্ষমতা নিয়ে। অবশ্যই সাইবার অপরাধ মোকাবিলার জন্য সাইবার থানা স্থাপন করতে হবে এবং এই সাইবার থানার কার্যক্রম সারা দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করতে হবে। এই থানায় যারা কাজ করবেন তাদের সাইবার অপরাধ বিষয়ে দক্ষ হতে হবে এবং তাদেরকে শুধু সাইবার অপরাধ বিষয়ক কাজেই মনোনিবেশ করতে হবে। সাইবার অপরাধ মোকাবেলার জন্য চাই ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব।

সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেনাল কোড, ১৮৬০ প্রভৃতি আইন রয়েছে বটে কিন্তু যেহেতু অপরাধটা প্রযুক্তি নির্ভর এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষতা সাধনের সাথে সাথে অপরাধের ধরনেও আসছে পরিবর্তন, তাই এই ধরনের অপরাধ মোকাবিলার আইনেও আসতে হবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন।

পাঠ্যপুস্তকে সাইবার সচেতনতামূলক বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সাইবার অপরাধের ভিকটিম কিভাবে আইনি সহায়তা পেতে পারে সেই আইনি বিষয়গুলোকে সহজ এবং বোধগম্য ভাষায় ব্যাপক আকারে প্রচার করতে হবে। এই জন্য আমাদের গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমে সাইবার সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায় আসলে সবার। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সকলের সম্মিলিত দৃঢ় প্রতিরোধই পারে এই অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করতে।

লেখক : সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading