দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে তিন চালিকাশক্তি

দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে তিন চালিকাশক্তি

মনির হোসেন । শুক্রবার, ১৩ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:৩০

স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরে দেশের অর্থনীতিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোতে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তিন চালিকাশক্তি। এগুলো হলো-কৃষি, গার্মেন্টস এবং রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। মোট বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্স থেকে। আর মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষিতে। শুধু অর্থনীতি নয়, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে খাতগুলো। দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টিহীনতা দূর, শিক্ষা, চিকিৎসা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাল্যবিয়ে রোধ, বিভিন্ন অপরাধ কমানো এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে খাতগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ এই তিন খাতের ওপর ভর করে এগিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সময়ের সঙ্গে মিল রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি।

দেশের অর্থনীতিতে তিন খাতের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই পোশাক খাতের। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরির ক্ষেত্রেও রেমিট্যান্সের বিশাল অবদান আছে। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান এবং তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ক্ষমতা বাড়িয়েছে এ খাত। অন্যদিকে মোট অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কিছুটা কমলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ খাতের বিশাল অবদান। তবে এখানে যেসব সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে দেশ আরও এগিয়ে যেত। বিশেষ করে তিন খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ দরকার। আগামীতে দেশের অর্থনীতির জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে ওমিক্রন কোথায় গিয়ে থামবে আমরা জানি না। এছাড়া বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় চলে এসেছে।

বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো কৃষিভিত্তিক। শস্য, মাঠ এবং প্রাণিসম্পদ-তিন খাতকে কৃষির মধ্যে ধরা হয়। দেশের ৭০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য সরবরাহের প্রধান উৎসই এ খাত। সরকারি তথ্য অনুসারে মোট দেশজ আয়ে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১৪ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের দিক থেকে প্রথম অবস্থানে এ খাত। বর্তমানে প্রায় ৭ কোটি শ্রমশক্তির মধ্যে কৃষিতেই রয়েছে দুই কোটি ৬০ লাখের বেশি। অর্থাৎ মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষিতে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ছিল এক কোটি ৮ লাখ টন। কিন্তু বর্তমানে তা চার কোটি ৫৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ কৃষির ওপর নির্ভর করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ। এছাড়া বিভিন্ন শিল্পে মূল্য সংযোজন করছে এ খাত।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেক চালিকাশক্তি পোশাক শিল্প। বর্তমানে বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। সারা পৃথিবীতে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ খ্যাতি দিয়েছে এই পণ্য। শ্রমঘন এ শিল্পটি ৪৪ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান করেছে। আর এ খাত থেকে এ বছর রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। আশির দশক পর্যন্ত মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। এরপর পাটকে পেছনে ফেলে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু। ১৯৮২ সালে কারখানার সংখ্যা ছিল ৪৭ এবং ১৯৮৫ সালে ৫৮৭, আর ১৯৯৯ সালে ২ হাজার ৯শ এবং বর্তমানে কারখানা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু গত দশ বছরের গড় হিসাবে মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ আসছে এ খাত থেকে। পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ নতুন উদ্যোক্তা দল সৃষ্টি করেছে। যারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী বেসরকারি খাত গড়ে তুলেছেন। এ খাতের হাত ধরেই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ হয়েছে।

গত পাঁচ দশকে দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তির ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে পৃথিবীর শীর্ষ দশে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। এ প্রবাসীরা মূলত স্বল্পশিক্ষিত। মূলত তারা গ্রামের বাসিন্দা। যারা গত সাড়ে চার দশকে ২১৭ বিলিয়ন ডলার আয় দেশে পাঠিয়েছেন।

আজকের যে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ, তার পেছনে প্রবাসীদের অবদান অন্যতম। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশকে ধরা হয়। আমরা যতগুলো বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে সেখান থেকে রক্ষা পেয়েছি। বিশেষ করে ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দাসহ অনেক সংকট পার করেছি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আমাদের রিজার্ভ ছিল শূন্যের কোঠায়। সেখানে ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিবছর দেশে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তার ১০ থেকে ২০ গুণ প্রবাসীরা পাঠায়। ২০ বছর আগেও বাজেট করতে সরকারকে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতো। বতর্মানে আমরা শ্রীলংকাকে ঋণ দিচ্ছি। অনেক বিশাল অর্জন। কিন্তু এরপরও প্রবাসীরা যথাযথ সম্মান পায় না। তিনি বলেন, বিদেশে আমরা দক্ষ জনবল পাঠালে আরও বেশি রেমিট্যান্স আসবে।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading