শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: বাংলাদেশের পুনর্জন্মের ভিত্তি

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: বাংলাদেশের পুনর্জন্মের ভিত্তি

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান । বুধবার, ১৮ মে ২০২২ । আপডেট ১২:০৫

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতাকে পরাজিত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ জাতি বিজয় অর্জন করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। পরাজিত হয় ’৫২, ’৫৪, ’৬১, ’৬৬, ’৬৯, ’৭০-এর বাঙালি চেতনার বিরুদ্ধাবলম্বনকারী শক্তি। কিছুদিনের জন্য পরাজিত শক্তি চুপচাপই ছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয় দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের বিরোধীপক্ষ ’৭১-এর পরাজিত শক্তি। আসলে ওই দিন যারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে তারা মূলত আবার পূর্ব পাকিস্তানকেই কায়েম করে। মোশতাক, জিয়ার নেতৃত্বে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন হয় আজীবন বাঙালিত্বের বিরোধিতাকারী অপশক্তি। ইতিহাসের চাকা ঘুরতে থাকে পেছনের দিকে। ১৯৭৬ সালের ৩ মে এক ফরমান জারি করে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নিষিদ্ধকৃত সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনর্বাসিত করেন।

রাজনীতিতে নিয়ে আসা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীকে। ১৯৭৬ সালের ২১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ কেড়ে নিয়ে কিছুদিন পর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে আইয়ুবীয় কায়দায় হ্যাঁ-না ভোটে ৮৮.৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে ৯৮.৮৮ শতাংশ ভোট তার পক্ষে দিয়েছে বলে প্রচার করেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই পিপিআর ঘোষিত হওয়ার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়। যদিও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় আরো দুটি আওয়ামী লীগ তৈরির চেষ্টা করা হয়। আওয়ামী লীগে একাধিক বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মূল আওয়ামী লীগই টিকে যায়। ১৯৮১ সালের ১৩-১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিল্লিতে কয়েক দফা বৈঠক হয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের। ইতোমধ্যে পাকিস্তানপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিএনপি দেশব্যাপী প্রচারণা শুরু করে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রতিরোধের জন্য। তারা সারাদেশে প্রচুর লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণ করে। জয় ও পুতুল জলবসন্তে আক্রান্ত হওয়ায় শেখ হাসিনার ঢাকা প্রত্যাবর্তন কয়েকদিন বিলম্বিত হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দুপুর ১২টায় পুতুলকে নিয়ে ঢাকায় আসেন শেখ হাসিনা। লাখ লাখ মানুষ রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়েছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যখন শেখ হাসিনা গণসংবর্ধনার মঞ্চে দাঁড়ালেন তখনো প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েছিল কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ। শেখ হাসিনা কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবেগময় ভাষণ দেন। তবে ভাষণে দৃঢ়তার কোনো অভাব ছিল না। আওয়ামী লীগের মতো স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী বৃহৎ সংগঠনটিকে নেতৃত্বদানে যে তিনি নিশ্চিতভাবে সফল হবেন তার বক্তৃতায় সে লক্ষণই পরিলক্ষিত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’ তার আগমনে গণজোয়ার নিয়ে আসে সারাদেশে। হতাশাগ্রস্ত আওয়ামী লীগ কর্মীরা সুসংগঠিত হতে শুরু করে। বিপন্ন যে জাতি দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের সব অর্জন হারাতে বসেছিল, তাদের মনে আবারো হারানো মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ফিরে পাওয়ার আশা ফিরে আসে। শুরু হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের পথচলা।

২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে অংশ নেন। শেখ হাসিনার বিজয় আঁচ করতে পেরে ক্যান্টনমেন্টবাসী অন্ধকারের শক্তি আবারো অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায়, জাগ্রত জনতার প্রতিরোধের ভয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিচক্ষণতায় তা ব্যর্থ হয়। ২৩ জুন সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলার জনগণ তাদের হৃত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আবার ফিরে পায়।

পরে একমাত্র শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তার কারণেই ২০০৯-পরবর্তী বাংলাদেশ সেনা বা সেনাসমর্থিত শাসনের অবসান হয়। বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নয়নের মহাসড়কে।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading