২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ভাবনা: চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ভাবনা: চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৮ মে

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৮ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০

করোনা মহামারি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থবির করে তুলেছিলো। সেই পরিস্থিতি থেকে বহুঅংশেই উন্নতি ঘটেছে। আবারও সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকাকালীনই দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক মন্দা, যার নেপথ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে আগামী মাসে আসছে বহুল প্রতিক্ষীত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট। বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবারের বাজেটের গুরুত্ব অনেক মনে করছেন অর্থনীতিবিদগণ। বাস্তবতা মোকাবেলা করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই আগামী বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তারা। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান

২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে। তারা বলছে, দারিদ্র্য বিমোচনকেই এবার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে গুরুত্ব পাবে মহামারি ও বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতিও। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগামী বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হচ্ছে ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। যা জিডিপি’র ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল জিডিপি’র ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে জিডিপি’র অংশ হিসেবে বাজেটের আকার ২ শতাংশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চলতি ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। বাজেটের আকার কমলেও নতুন অর্থবছরে ঘাটতি থাকবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। যা জিডিপি’র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি’র প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৪ লাখ ১২ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা (জিডিপি’র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ)। তবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের হার কমানো হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সব মিলিয়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ১২ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নতুন বাজেটে এনবিআরকে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআর-এর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল

বাজেটে বাড়বে না করের বোঝা: অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দারিদ্র্য বিমোচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের কাজ চলছে। সরকারের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই প্রণীত হবে আগামী বাজেট। জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেটে জনগণের ওপর নতুন করে করের বোঝা চাপানো হবে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন মন্ত্রী। দেশের মানুষের কষ্ট বা ভোগান্তি যাতে করে না বাড়ে এবং তাদের ওপরে যেন বোঝা বেশি না বাড়ে সেগুলোর জন্য আমরা কাজ করছি। আশা করছি এগুলো কমবেশি বিবেচনায় নেব। অর্থমন্ত্রী আরও জানান, এ বছরের বাজেট অন্যান্য বছরের মত না। এবার আরও স্বচ্ছ উপায়ে বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১১ লাখ উপকারভোগী বাড়ছে: অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১১ লাখ উপকারভোগী বাড়ছে। অর্থ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতের আওতায় ১২৩টি কর্মসূচি রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এর মধ্যে ৮টি কর্মসূচি হচ্ছে নগদ ভাতা সংক্রান্ত, বাকি ১১টি খাদ্য সহায়তার। সরকারের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের (এনএসএসএস) মধ্যবর্তী উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলেও এখানে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন, খাদ্য, কৃষি ভর্তুকি, ক্ষুদ্র ঋণসহ নানা কার্যক্রমের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক কল্যাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্ম সৃজন, অবসর ও পারিবারিক ভাতা এবং অন্যান্যসহ মোট ছয় খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করা হচ্ছে। আগামী বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি বাজেটে এ খাতে ১৮ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তায় ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা, খাদ্য বান্ধব কর্মসূচিও রয়েছে। নতুন বাজেটে সামাজিক কল্যাণ খাতে ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি বাজেটে ৩২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা রয়েছে। এ খাতের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, বেদে, হিজড়া ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করা হয়। আগামী বছরের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নে ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি বাজেটে রয়েছে ৫ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা উপবৃত্তি, প্রাথমিক ছাত্র-ছাত্রী উপবৃত্তি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তিতে এ টাকা ব্যয় হবে। অবসর ও পারিবারিক ভাতায় নতুন বাজেটে ২৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি বাজেটে রয়েছে ২৬ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। বয়স্ক, বিধবা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, মাতৃত্বকালীণ ভাতা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিতে এ টাকা ব্যয় হবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনাই সরকারের লক্ষ্য: পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, আগামী জাতীয় বাজেটে দেশে দারিদ্র্যতার হার কমিয়ে ও স্বাক্ষরতার হার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনাই হচ্ছে সরকারের অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা। করোনা মোকাবিলায় সরকার আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। আগামী দিনে এ অর্জন ধরে রাখতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যেটা আসছে সেটির সঙ্গে আমাদের তরুণ প্রজš§কে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি আইসিটি খাতে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের তরুণরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকে ঘরে বসেও আয় করছে। এ খাতটিকে আমাদের শক্তিশালী করতে হবে।

বিগত বাজেটগুলোতে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে সরকার: কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, আমরা বিগত বাজেটগুলো দেওয়ার পর আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছি। আমরা পরিকল্পনামতো বাস্তবায়ন করেছি। তিনি আরও বলেন, করোনা পরিস্থিতি সারা বিশ্বের মতো আমাদের ভুগিয়েছে। তবু অনেক দেশের চেয়ে বিশেষ করে এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সবচেয়ে ভাল অবস্থানে ছিল। কিন্তু চলতি বছর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সারা বিশ্বের মতো আমাদের চিন্তায় ফেলেছে। কেননা সারা বিশ্বের ৪০ ভাগ খাদ্য ইউক্রেন সরবরাহ করে থাকে। সেখানে যুদ্ধের কারণে গম, ভুট্টা উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সেখানে কৃষকরা ফসল ফলাতে পারছে না। আগামী ছয় মাস পর দেশের খাদ্য নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। কৃষিমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে ভোজ্যতেল নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগামী ছয়মাস পর বিনিয়োগ ব্যবস্থা কী হবে। আমরা গত ১১ বছর ধরে ভর্তুকি দিয়ে আসছি। তš§ধ্যে দেখা গেছে, এ বছর বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতির সফলতা এসেছে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান অর্থনীতির স্থিতিশীলতা: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির প্রথম নির্বাহী পরিচালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। যতি এই স্থিতিশীলতা না থাকে তাহলে আর কিছুই থাকবে না। এই বাজেট অনেক বড় বাজেট। আমি বলি এটা ফিসক্যাল ইউলেশন। যে বাজেট ঘোষণা করা হয়, তা সংশোধনের সময় ২০ শতাংশ কেটে দেওয়া হয়। এছাড়া, বাংলাদেশ সাড়ে ১৬ কোটির দেশ। ৭৪ লাখ লোকের ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) রয়েছে। আর ট্যাক্স দেয় শুধু ৩০ লাখ মানুষ। মানুষ ট্যাক্স দেয় না কেন ?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

রপ্তানি বাণিজ্যের বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টার গতি-প্রকৃতি পর্যালোচনা করা জরুরি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তার বাজেট ভাবনা নিয়ে বলেন, মহামারি করোনা উত্তর সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। গতি কিছুটা মন্থর হলেও বিভিন্ন খাতে অর্থনীতির পুনর্জাগরণ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকেও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। কারণ বিশ্ব অর্থনীতিতে কভিড সম্পর্কিত নেতিবাচক প্রভাবগুলো এখনো কাটেনি এবং দ্রুতই কাটবে না। তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণায় সরকারকে কিছু বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বোঝাই যাচ্ছে যে এবারের বাজেট প্রণয়নে সরকারকে একদিকে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থায় বাজেটে প্রথমেই বহির্বিশ্বের চ্যালেঞ্জের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এ জন্য আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টার গতি-প্রকৃতি পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সমস্যায় ফেলেছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৮ মে ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

নিশ্চিত করতে হবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেছেন, আগামী বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় অর্থনীতি সুদৃঢ় হয়েছে। করোনার মধ্যে ও ৬ দশমিকের ওপরে। মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক আয় ও রিজার্ভ বেড়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে করোনার পর রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধটা আমাদের সমস্যায় ফেলেছে। সামনের বাজেট আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে। গত কয়েক বছরে আমাদের প্রাইভেট সেক্টরে হয়তো ইনভেস্টমেন্ট ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ২২ সালকে নির্মাণসামগ্রীর বছর ঘোষণা করেছেন। সম্প্রতি আমেরিকার একটি প্রতিনিধিরা এসেছেন তারা এখানে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading