জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবর: উজবেক শাসক থেকে উপমহাদেশের সম্রাট
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ । আপডেট ১২:০০
তৎকালীন সুলতান ইব্রাহিম লোধিকে পরাজিত করে ১৫২৬ সালে ইন্ডিয়াতে মুঘল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন বাবর। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক হন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। যা ৩০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। শৈশব থেকেই বাবর ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তিনি তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন। বাবর নিজেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর বলে দাবী করতেন। ইন্ডিয়ান উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
বাবর নিজেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর বলে দাবী করতেন। বাবর ৫ বার ইন্ডিয়া আক্রমণ করেন ও প্রতিবারই জয় লাভ করেন। বাবর তার রাজত্বকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাবরের এই মুঘল রাজবংশ ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইন্ডিয়া শাসন করেছিল।
বাবরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বাবর ছিলেন মধ্য এশিয়ার মুসলমান সম্রাট। তার পুরো নাম জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবর। তার জন্ম উজবেকিস্তান। বাবর ইন্ডিয়া উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি তৈমুর লঙ্গ-এর বংশধর এবং মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। তিনি মির্জা ওমর সাঈখ বেগ এর পুত্র, এবং তৈমুরী শাসক উলুগ বেগ এর প্রপৌত্র ছিলেন।
বাবর পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লীর লোদি রাজবংশের সুলতান ইবরাহিম লোদিকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বাবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র মির্জা হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহণ করেন। পানি পথের যুদ্ধে তিনিই প্রথম কামানের ব্যবহার করেন। বাবরের প্রখর রণকৌশলের কাছে হার মানে ইবরাহিম লোদি। বাবরের মোট ১১ জন স্ত্রী ছিল। তার মোট ১৯টি সন্তান ছিল।
বাবর এর জন্ম ও পরিবার
বাবর ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকার আন্দিজান নামে একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবরের পিতার নাম ছিল উমর শেখ মির্জা, যিনি ফারগানা উপত্যকার শাসক ছিলেন। বাবর ছিলেন তার মা কুতলুগ নিগার খানমের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বাবরের মাতৃভাষা ছিল জগতাই। কিন্তু সে সময় সেখানে প্রচলিত কথ্য ভাষা ছিল ফারসি। বাবরেরও ফারসি ভাষায় সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল। বাবুর মাতৃভাষা জগতই বাবুরনামা নামে তার জীবনী লিখেছেন।
বাবরের ইন্ডিয়া আসার করন
বাবরের রাজত্ব শুরু হলে তিনি মধ্য এশিয়ায় তার শাসন বিস্তারের একটি তালিকা তৈরি করেন, কিন্তু বাবর সেখানে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পারেননি। এর পর তার চোখ পড়ে ইন্ডিয়ার দিকে। তখন ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই দুর্বল ছিল, যা বাবরের ইন্ডিয়াতে আসার অনুকূল ছিল। সেই সময়ে ইব্রাহিম লোধি দিল্লির সুলতান ছিলেন।
ইব্রাহিম লোধির চাচা আলম খান তার ব্যর্থতা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন, কারণ তিনি দিল্লি সালতানাতের উপর শাসন করতে চেয়েছিলেন। একই সময়ে, পাঞ্জাবের গভর্নর দৌলত খানও লোধির কাজ পছন্দ করছিলেন না। আলম খান ও দৌলত খান বাবরকে ভালো করেই চিনতেন। সে সময় তিনি বাবরকে দিল্লি আসার আমন্ত্রণ পাঠান। বাবর পছন্দ করলেন যে তিনি দিল্লিতে এসে তার সাম্রাজ্য বৃদ্ধির সুযোগ পেতে চলেছেন।
বাবরের পানিপথের যুদ্ধ
বাবর ১৫২৬ সালে ইব্রাহিম লোধির সাথে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ করেছিলেন। বাবর এই যুদ্ধের আগে চারবার যুদ্ধস্থল তদন্ত করেছিলেন, যেখানে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল। বাবর এই কাজটি করেছিলেন শুধুমাত্র যুদ্ধে একটি কৌশল তৈরি করার জন্য, যাতে তিনি সহজেই জয়ী হতে পারেন। মেওয়ারের মহারাজা রানা সংগ্রাম সিং-এরও একই অভিপ্রায় ছিল, আকবর ও লোধির মধ্যে যুদ্ধ হোক, কারণ লোধিও রানা সংগ্রাম সিং-এর শত্রু ছিলেন।
রাজা সংগ্রাম সিংকেও পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সংগঠিত করতে হয়েছিল, আগুনে ঘি যোগ করার কাজ করেছিলেন। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর বিজয় লাভ করেন। ইব্রাহিম লোদী নিজেকে পরাজিত ও অসহায় দেখে আত্মহত্যা করেন।
বাবরের খানবার যুদ্ধ
বাবর যে সমস্ত যুদ্ধ করেছিলেন তার মধ্যে খানওয়া যুদ্ধ ছিল একটি প্রধান যুদ্ধ। খানওয়া গ্রামের চারপাশে বাবর এই যুদ্ধ করেন। রানা সংগ্রাম সিং ভেবেছিলেন পানিপথের প্রথম যুদ্ধের পর বাবর স্বদেশে ফিরে যাবেন, কিন্তু তা হয়নি। বাবর ইন্ডিয়াতে থেকে শাসন করার মনস্থির করেছিলেন। ফলে রানা সংগ্রাম সিংকেও বাবরের সাথে যুদ্ধে নামতে হয়। এই যুদ্ধ ১৫২৭ সালের ১৭ মার্চ সংঘটিত হয়েছিল। এতে রাজপুতরা তাদের বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেও বাবরের কামানের কারণে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি এবং যুদ্ধে হেরে যান।
বাবরের ঘাগরা যুদ্ধ
বাবর এ পর্যন্ত বহু শাসক ও রাজপুতকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। এ কারণে বিহার ও বাংলার ও আফগান শাসকরা বাবরের বিরোধিতা করে এবং তাকে ফেরত পাঠানোর কৌশল তৈরি করতে থাকে। বাবর একের পর এক যুদ্ধে জয়লাভ করেন। যার কারণে তিনি নিজেকে নিয়ে আরও গর্বিত হয়ে ওঠেন, যার ফলস্বরূপ ১৫২৯ সালে বাবর এবং আফগান শাসকদের মধ্যে একটি যুদ্ধ শুরু হয়। ঘাঘরার যুদ্ধেও বাবর সহজেই জয়লাভ করেন।
বাবরের মুঘল সাম্রাজ্যের স্থাপনা
বাবর ৫ বার ইন্ডিয়া আক্রমণ করেন। বাবর প্রথম পানিপথের প্রথম যুদ্ধের পর মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বাবরের এই মুঘল রাজবংশ ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইন্ডিয়া শাসন করেছিল। বাবর তার রাজত্বকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাবরের লেখা বাবুরনামায় বাবরের জীবনের সমস্ত বিষয় বাবর নিজেই বর্ণনা করেছেন।
বাবর এর মৃত্যু
১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর আগ্রায় বাবর দ্য গ্রেটের মৃত্যু হয়। আগ্রা তখন মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মৃত্যুর আগে বাবর হুমায়ুনকে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী করেন।
ইউডি/অনিক

