আবদুল গাফফার চৌধুরী: আমরা কি তোমাকে ভুলিতে পারি!

আবদুল গাফফার চৌধুরী: আমরা কি তোমাকে ভুলিতে পারি!

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫

বর্ষীয়ান লেখক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও জনপ্রিয় কলামিস্ট, ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’-এর রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী আর নেই। ব্রিটেনের লন্ডনে স্থানীয় সময় বুধবার রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ছিল অপরিসীম। তার মৃত্যুতে গোটা জাতিই শোকে স্থবির। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত

১৯৭৪ সালের অক্টোবর থেকেই ব্রিটেনে বসবাস করছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। বেশ ক’ বছর ধরেই ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে। সেখান থেকে আর ফেরা হলো না। ৮৭ বছরেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হলো বাংলাদেশের এই কলম সৈনিককে। শুধু ভাষা আন্দোলনই নয় স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিবনগর সরকারে মাধ্যমে নিবন্ধিত স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক জয় বাংলার’ প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন এই গাফফার চৌধুরী।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ

জাতিকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তির আন্দোলনে অসীম সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছিল’: গাফফার চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, এ মৃত্যু দেশের জন্য ‘অপূরণীয় ক্ষতি’। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেছেন, গাফফার চৌধুরীর লেখা একুশের অমর সেই গান বাঙালি জাতিকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তির আন্দোলনে অসীম সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছিল। তার মৃত্যু দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কালজয়ী গান ও লেখার মাধ্যমে তিনি প্রতিটি বাঙালির হƒদয়ে চির অম্লান হয়ে থাকবেন। রাষ্ট্রপতি তার শোক বার্তায় বলেন, আব্দুল গাফফার চৌধুরীর মৃত্যুতে বাংলাদেশ প্রগতিশীল, সৃজনশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন অগ্রপথিককে হারাল। তিনি একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট। লেখনীর মাধ্যমে তিনি আজীবন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কাজ করে গেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

জাতি একজন বিজ্ঞ ও পুরোধা ব্যক্তিকে হারাল: গাফফার চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একজন বিজ্ঞ ও পুরোধা ব্যক্তিকে জাতি হারাল, যিনি তার লেখা ও গবেষণায় বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে বহু স্মৃতির কথা, নানা সময়ে তার পরামর্শ পাওয়ার কথাও সরকারপ্রধান স্মরণ করেছেন তার শোকবার্তায়।

প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বলেন, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার মেধা-কর্ম ও লেখনীতে এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছেন। তিনি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মননকে ধারণ করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে সমর্থন করে জাতির সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকার নিবন্ধিত সাপ্তাহিক জয়বাংলা পত্রিকায় বিভিন্ন লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। পরবর্তীতে তিনি প্রবাসে থেকেও তার লেখনীর মাধ্যমে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী দেশেই শায়িত হবেন: দেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন বরেণ্য সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলাদেশে দাফন করা হবে।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন ব্রিটেনের যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জামাল আহমেদ খান জানান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী জীবিত অবস্থায় আমাদের বলে গেছেন, তিনি মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশে তার স্ত্রীর কবরের পাশে যেন তাকে দাফন করা হয়। এখন উনার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী এবং তার সন্তানদের মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশেই তাকে দাফন হবে। জামাল আহমেদ খান বলেন, লন্ডনে জানাজা শেষে উনার মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে দেশে যাবেন।

গাফফার চৌধুরীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন: আবদুল গাফফার চৌধুরী ১২ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে বরিশালের উলানিয়ার চৌধুরী বাড়িতে জš§গ্রহণ করেন। তার বাবা হাজি ওয়াহিদ রেজা চৌধুরী ও মা মোসাম্মৎ জহুরা খাতুন। আবদুল গাফফার চৌধুরী উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় ক্লাস সিক্স পর্যন্ত লেখাপড়া করে হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে বিএ অনার্স পাস করেন। ১৯৫০ সালে গাফফার চৌধুরী দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরের বছ দৈনিক সংবাদ প্রকাশ হলে গাফফার চৌধুরী সেখানে অনুবাদকের কাজ নেন। ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের মাসিক সওগাত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন গাফফার চৌধুরী। এ সময় তিনি ‘মাসিক নকীব’ও সম্পাদনা করেন। একই বছর তিনি আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘দিলরুবা’ পত্রিকারও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। ওই বছরই তিনি প্যারামাউন্ট প্রেসের সাহিত্য পত্রিকা ‘মেঘনা’র সম্পাদক হন। এরপর তিনি দৈনিক আজাদ এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে তিনি সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’র সম্পাদক হন। পরের বছর ১৯৬৪ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় নামেন এবং ‘অণুপম মুদ্রণ’ নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। দু’বছর পরই আবার ফিরে আসেন সাংবাদিকতায়। ১৯৬৬ সালে তিনি দৈনিক ‘আওয়াজ’ বের করেন। পত্রিকাটি ছয় দফা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে। ১৯৬৭ সালে আবার তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ ফিরে যান সহকারী সম্পাদক হিসেবে। ১৯৬৯ সালে আবার ফিরে যান দৈনিক ইত্তেফাকে। ১৯৬৯ সালে তিনি অবজারভার গ্রুপের দৈনিক ‘পূর্বদেশ’-এ যোগ দেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সপরিবারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌঁছান। সেখানে মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’য় লেখালেখি করেন। এ সময় তিনি কলকাতায় ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ ও ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘দৈনিক জনপদ’ বের করেন। ১৯৭৪ সালে লন্ডনে পাড়ি জমান গাফফার চৌধুরী। এরপর তার প্রবাস জীবনের ইতিহাস শুরু হয়। সেখানে ১৯৭৬ সালে তিনি ‘বাংলার ডাক’ নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। আরও একাধিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। প্রবাসে বসে গাফফার চৌধুরী বাংলাদেশের প্রধান পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তিনি স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পদক, ইউনেস্কো পদক, বঙ্গবন্ধু পুরস্কারসহ জাতীয় আন্তর্জাতিক অনেক পুরস্কার লাভ করেন।

একুশের সেই অবিনাশী গান যেভাবে এল: মায়ের ভাষার দাবিতে ফুঁসে ওঠা বাঙালির মিছিলে পুলিশ গুলি ছুড়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে; সেই আন্দোলনের সংগ্রামী রফিকের নিথর দেহ হাসপাতালে দেখে কলেজ ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরীর হƒদয়ে জাগে ভাই হারানোর বেদনা। তিনি লেখেন এক অমর কবিতা: আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রথমে আব্দুল লতিফ ও পরে আলতাফ মাহমুদের সুরে সেই কবিতা হয় গান। বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন আর বাঙালির ইতিহাসে অমর হয়ে যাওয়া সেই গান সৃষ্টির গল্প এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন সাংবাদিক, কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী। ঢাকা মেডিকেলে আহত ছাত্রদের দেখতে গিয়েছিলেন তখনকার ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী। মেডিকেলের বহির্বিভাগে তিনি ভাষা সংগ্রামী রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়া লাশ দেখতে পান। লাশটি দেখে তার বারবার মনে হতে থাকে, এটা যেন তার নিজের ভাইয়েরই রক্তমাখা লাশ। তখনই তার মাথায় আসে একটি লাইন, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। এরপর ইতিহাস হয়ে যায় সেই কবিতা। যাতে সুর করেন আলতাফ মাহমুদ। হয়ে ওঠে বাঙালির ভাষার গান, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।

পৃথিবীতে একটি মাত্র গান লিখে যিনি অমর হয়েছেন, তিনি গাফফার চৌধুরী: আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মতো সাহিত্যিক-সাংবাদিক আর কোনোদিন বাংলাদেশে আসবে না। তিনি সাংবাদিকতায় ছিলেন এক নম্বরে, কলাম লেখায় ছিলেন যেমন এক নম্বরে, তেমনি সাহিত্যিক হিসেবেও পঞ্চাশের দশকে ছিলেন প্রথম সারির একজন।’ সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মৃত্যুতে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লেখক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন এ মন্তব্য করেন।
ড. মামুন গভীর শোক প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ষাট বছর কলাম লিখে তার মতো আর কেউ সমানতালে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেননি বাংলাদেশে। সম্ভবত, এটি পৃথিবীর ইতিহাসেও একটি বিরল ঘটনা। তিনি দেশে থাকলে আরও অনেক অনেক সৃষ্টি আমাদের উপহার দিতে পারতেন। প্রবাসে কষ্টসাধ্য জীবনযাপন করে তার পক্ষে সে উপহার দেওয়া আর সম্ভব হয়নি।’ গাফ্ফার চৌধুরীর বন্ধুসম এই ইতিহাসবিদ বলেন, আমাদের প্রতিটি গণ-আন্দোলনে গাফফার চৌধুরীর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়ে জনমত সৃষ্টিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। আমি গতকালই আলাপ করছিলাম, পৃথিবীতে একটি মাত্র গান লিখে যিনি অমর হয়েছেন, তিনি গাফফার চৌধুরী।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২০ মে ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

পঁচাত্তরের অগাস্ট ট্রাজেডি নিয়ে সিনেমা নির্মাণ আর হলো না: পঁচাত্তরের অগাস্ট ট্রাজেডি নিয়ে একটি সিনেমা তৈরি করেছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর গোটা জীবন নিয়ে চেয়েছিলেন আরেকটি সিনেমা বানাতে, কিন্তু তা আর হল না। তার আগেই চিরতরে বিদায় নিলেন। গাফফার চৌধুরী তার স্বলিখিত রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পলাশী থেকে ধানমøি’ অবলম্বনে ২০০৭ সালে একটি টিভি চলচ্চিত্র তৈরি করে। তাতে অর্থায়ন করেছিল শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টার, লন্ডন। তার আগে ২০০৫ সালের দিকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি নাটক করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। পরে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। লন্ডনের এক সাংবাদিকের পরামর্শে সেই চলচ্চিত্রের নাম দেন ‘দ্য পোয়েট অব পলিটিক্স’। কিন্তু অর্থের সংস্থান করতে না পারার কারণে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে সিনেমাটির কাজ আর এগোয়নি।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading