রুখতে হবে টিকটক উন্মাদদের দৌরাত্ম্য

রুখতে হবে টিকটক উন্মাদদের দৌরাত্ম্য

যোবায়ের সানি । রবিবার, ২২ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:৫৫

তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে বদলে গেছে অনেক কিছুই। জীবনযাপনেও এসেছে পরিবর্তন। দৈনন্দিন জীবনে এসেছে নানা উপকরণ। এই নতুন আবিষ্কার আমাদের যেমন সমৃদ্ধ করেছে; তেমনই বিব্রতও করছে। স্মার্টফোন, ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম, মেসেঞ্জার, টুইটার, ইউটিউব, টিকটক, লাইকি, পাবজি আমাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এর যেমন ইতিবাচক দিক আছে; তেমনই আছে নেতিবাচকতাও। সব উদ্ভাবনই মানুষের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে। তবে তা গুটিকয়েক অসাধু লোকের কারণে ক্ষতির কারণও হয়ে উঠছে।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় টিকটকের কথা। টিকটক সব শ্রেণি-পেশার বা বয়সের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এটি ব্যবহারেও বিধিনিষেধ নেই। ফলে ঢালাওভাবে বেড়ে যাচ্ছে ব্যবহারকারীর সংখ্যা। তাতেও অসুবিধা থাকার কথা নয়। অসুবিধা হয়ে দাঁড়ায় টিকটকের কনটেন্টের মান নির্ণয় করতে গেলে। টিকটক কর্তৃপক্ষ সেদিকে নজরও রাখে। অনেকের আইডি ব্যানড করা হয়। আপত্তিকর কনটেন্টও মুছে দেওয়া হয়। তার পরও ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’র মতো অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই থাকে। যে কারণে টিকটক ব্যবহারকারীকে সমাজ, পরিবার, স্বজনরা বাঁকা চোখে দেখেন। অথচ এটিও হতে পারত সুস্থ বিনোদনচর্চার শক্তিশালী মাধ্যম।

২০১৬ সালে অ্যাপসভিত্তিক ভিডিও পস্ন্যাটফর্ম টিকটক যাত্রা শুরু করে। ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও ব্যাপক জনপ্রিয় টিকটক। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এখন স্মার্টফোনের পাশাপাশি টিকটকও এখন জায়গা করে নিয়েছে। টিকটকে সংক্ষিপ্ত ভিডিওর মাধ্যমে নাচ, গান, বক্তব্যসহ নানা বিষয় প্রচার করা যায়। ফলে স্ব স্ব মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তারকা ব্যক্তিরা টিকটকে যুক্ত হওয়া ছাড়াও শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সি মানুষজন টিকটকের জন্য ভিডিও তৈরি করছে। প্রযুক্তির যে কোনো সৃষ্টিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করা গেলেও নেতিবাচক কাজেই বেশি ব্যবহার হয়, টিকটকের বেলাতেও তাই হয়েছে। অশ্লীল, অসামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের পরিপন্থি ভিডিওতে সয়লাব এখন টিকটক।

টিকটকে ভিডিও আপলোড করলে সবাই দেখবে, বাহবা দেবে এবং আয়-রোজগারও করা যাবে, মূলত এই ভাবনা থেকেই সব শ্রেণির মানুষ টিকটকে মত্ত হয়েছে। টিকটকে বহু ইতিবাচক কনটেন্ট দেখা গেলেও অশ্লীল ও রুচিহীন কনটেন্টের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা টিকটক ভিডিও করছে তাদের অনেকেই রাস্তাঘাটে, মসজিদের সামনে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে ভিডিও ধারণ করছেন। এই সময়ে তরুণ-তরুণীদের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ও কান্ডকারখানায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবমাননা হচ্ছে এবং মানুষজনকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো মসজিদের সামনে, এমনকি মসজিদে গিয়েও টিকটক করা হচ্ছে। এছাড়াও গ্রাম-শহরের ব্যস্ত রাস্তার মাঝে শুয়ে-বসে টিকটক করার ফলে গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, দুর্ঘটনাও ঘটছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি অটোরিকশা করে গ্রামের বাড়ি থেকে বাজারে যাওয়ার পথে খেয়াল করলাম দুটি ছেলে রাস্তার মাঝে শুয়ে আছে এবং দুটি ছেলে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তেই ভাবলাম কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কিংবা ছেলেরা মারামারি করছে কিনা, কিন্তু একি! কাছে গিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো শুয়ে থাকা ছেলেগুলোর ভিডিও ধারণ করছে। এই ঘটনা দেশব্যাপী ঘটছে এখন। টিকটকের নেশায় তরুণ-তরুণীরা উন্মাদের মতো হয়ে গেছে।

প্রযুক্তির যে কোনো উদ্ভাবনেরই ইতিবাচক দিক আছে। যতটুকু সম্ভব ভালো কাজে ব্যবহার করা হলে এবং ওই কাজ করতে গিয়ে নিজ কিংবা অন্যের ক্ষতি কিংবা সামাজিক অনাচার না হলে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়া যায়, কিন্তু টিকটক করতে গিয়ে বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অশ্লীল ও অসামাজিক ভিডিও করা কিংবা ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা রাস্তাঘাটে উন্মাদের মতো কর্মকান্ড করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এছাড়াও অশ্লীল ও অসামাজিক কনটেন্টের মাধ্যমে পরিবারের ছোট সদস্যরা প্রভাবিত হচ্ছে। এই অবস্থায় টিকটকের বাস্তবতা মাথায় রেখে ভালো-মন্দ কনটেন্টের তফাৎ নির্ণয় করে মন্দ কনটেন্ট সরিয়ে নেয়া এবং টিকটকাররা যাতে মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ব্যস্ত রাস্তাঘাট কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভিডিও তৈরি করতে না পারে সে বিষয়ে অবশ্যই দ্রম্নততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টিকটক ভিডিও করতে গিয়ে বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দেয়া টিকটকারদের রুখে দিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading