জেমস ওয়াট: তার আবিষ্কার মানব জীবনকে করেছিল গতিময়
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
নতুন নতুন জিনিসের আবিষ্কারের দ্বারা বিশ্বসভ্যতায় যারা অপরিমেয় অবদান রেখেছেন, মানুষের জীবন হয়েছে গতিময়, সুন্দর, জেমস ওয়াট তাদের মধ্যে অন্যতম। বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের আবিষ্কারক হিসাবে জেমস ওয়াট অমর হয়ে আছেন। আধুনিক যন্ত্রযুগ জেমস ওয়াটের কাছে বিশেষভাবে ঋণী। বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের আবিষ্কারক জেমস ওয়াটের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
জেমস ওয়াট শুধু ইঞ্জিনই তৈরি করেননি, আরও নানা রকম যন্ত্রপাতিও তিনি তৈরি করেছিলেন। তবে ইঞ্জিনের জন্যেই তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। এই ইঞ্জিনকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেই পরে জেমস স্টিভেনসন তৈরি করেছিলেন রেলগাড়ির ইঞ্জিন।
জেমস ওয়াট কে ছিলেন?
স্কটিশ প্রকৌশলী, উদ্ভাবক জেমস ওয়াট অমর হয়ে আছেন বাষ্পীয় ইঞ্জিন উদ্ভাবনের কারণে। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের কথা উঠলে জেমস ওয়াটের কথাও ওঠে। কিন্তু জেমস ওয়াট বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার করেননি বরং বলা ভালো তিনি উন্নততর করেছেন।
জেমস ওয়াটের জন্ম
জেমস ওয়াট ১৭৩৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের অন্তর্গত গ্রীনক এর এক ছোট বণিক পরিবারে জেমস ওয়াট জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন খুব চিন্তাশীল। পড়াশুনা বেশিদূর করতে পারেননি। তার আগেই তাকে জীবিকার পথ অর্ষেণ করতে হয়। কয়েক বছর আগেও রেলগাড়ি টেনে নিয়ে যেত বাষ্পচালিত ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিনের এমনই শক্তি যে, একটা বড় আর লম্বা রেলগাড়িকে সে সহজেই খুব দ্রুত টেনে নিয়ে যেতে পারে। এই ইঞ্জিন তৈরি করে বিখ্যাত হয়ে আছেন জেমস ওয়াট।
জেমস ওয়াটের কর্মজীবন
জেমস ওয়াটের বয়স যখন উনিশ, তখন তিনি লন্ডনের এক বস্ত্র তৈরির কারখানায় শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজ শুরু করেন। জেমস ওয়াট সম্বন্ধে একটা ঘটনা প্রচলিত আছে। একবার ছোটবেলায় একদিন মায়ের সাথে রান্নাঘরে বসে আছেন। মা চুলায় চা জ্বাল দিচ্ছেন একটা কেটলিতে। কেটলির ঢাকনা বন্ধ। পানি টব করে ফুটে উঠে এক সময় ঢাকনাটাকে ফেলে দিলো। অমনি ওয়াট ভাবতে লাগলো এমন হলো কেন? ভাবলেন নিশ্চয়ই পানি গরম হয়ে যে বাষ্পের সৃষ্টি করছে এটা তারই কাজ। এ বাষ্প তো দেখা যায় বেশ শক্তিশালী। এই শক্তিকে কী কোনো কাজে লাগানো যায় না?
ওয়াট একসময় গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিলেন। সেখানে তার কাজ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহার উপযোগী গাণিতিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ করা। বৈজ্ঞানিক জোসেফ ব্ল্যাক তখন গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাপবিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোচনা উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা বাষ্পের বিভিন্ন তথ্যাদি নিয়ে আলোচনা করতেন। জেমস ওয়াট মন দিয়ে সেইসব আলোচনা শুনতেন। তার মনের গভীরে গ্রোথিত ছোটবেলাকার সেই জলের কেটলির বাষ্প সম্পর্কিত ঘটনাটা।
বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার ও পেটেন্ট লাভ
এ সময় ব্রিটিশ কয়লা খনির মালিকগণ তাদের খনির কাজে ১৭১২ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী টমাস নিউকোমনের এক ধরনের বাষ্পচালিত পাম্পিংইঞ্জিন ব্যবহার করে আসছিলেন, যা দিয়ে কেবল কয়লাখনি থেকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব ছিলো। নিউকোমনের আবিষ্কৃত যন্ত্রটিতে ছিলো পৃথক একটি বয়লার এবং ইঞ্জিন। তাতে স্বাভাবিকভাবে বাষ্প ঘনীভূত করার ব্যবস্থা ছিলো না। ইঞ্জিনটিতে প্রচুর কয়লা পোড়াতে হয়।
বিষয়টি জেমস ওয়াটকে ভাবিয়ে তুললো। তিনি এর প্রতিকারের চিন্তা করতে লাগলেন। মস্তিষ্ক ও হাত এই দুইয়ের সাহায্যে জেমস ওয়াট কাজ করতেন। ওয়াট বাপের ধর্ম ও গুণাগুণ সম্পর্কে গবেষণা শুরু করে দিলেন। আর এভাবেই একটি বাষ্পচালিত ইঞ্জিন নির্মাণের পরিকল্পনা তার মাথায় জেগে উঠলো।
একদিন ওয়াট পরিকল্পিত ইঞ্জিন বাস্তবে রূপ পেল। ১৭৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে জেমস ওয়াট এই বাষ্পচালিত ইঞ্জিন নির্মাণের পেটেন্ট লাভ করলেন। জেমস ওয়াট ১৭৮১ সালে এক সেট গীয়ার আবিষ্কার করেন। গীয়ারের সাহায্যে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ব্যবহারের ব্যাপকতা আরও বৃদ্ধি পায়।
বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি
১৭৮৮ সালে তিনি সেন্ট্রিফিউগাল গভর্নর যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ১৭৯০ সালে প্রেসার গেজ, এরপর একটা কাউন্টার বা গণক, ইন্ডিকেটর বা নির্দেশক এবং গ্লুটুল ভাল্ব উদ্ভাবন করেন। যার ফলে তার বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের উত্তরোত্তর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
জেমস ওয়াট এর স্টিম ইঞ্জিন
১৮০৪ সালে প্রথম লোকোমোটিভ স্টীম ইঞ্জিন নির্মিত হয়। এর কয়েক দশকের মধ্যেই জেমস ওয়াটের পথ ধরেই ইঞ্জিনচালিত স্টীমার এবং রেল জলপথে ও স্থলপথে বিপ্লব সাধন করে। ১৮০০ সালে জেমস ওয়াট চৌষট্টি বছর বয়সে কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং তার দুই পুত্র জেস ও গ্রেগরীকে তার সবকিছু বুঝিয়ে দেন।
জেমস ওয়াটের মৃত্যু
১৮১৯ সালের ১৯শে আগস্ট জেমস ওয়াট ৮৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। তার আবিষ্কার আজও মানব কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউডি/অনিক

