জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী টেকসই পরিকল্পনা

জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী টেকসই পরিকল্পনা
জলাবদ্ধতা-দৈনিক উত্তরদক্ষিণ

মো. আবু সাঈদ । বুধবার, ২৫ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:৪৫

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে দেশের ছোট-বড় সব শহরেই কমবেশি জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। জলাবদ্ধতা জনজীবনে ভয়ংকর দুর্ভোগ-দুর্গতি ডেকে আনে। বিগত অনেক বছর জলাবদ্ধতার তিক্ত অভিজ্ঞতা রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের আরো কয়েকটি নগর ও শহরবাসীর মনে রয়েছে।

সাধারণত প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দেশের বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আমাদের গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ হয় জুন থেকে অক্টোবর মাসে। ওই সময়টিতে একটু ভারি বৃষ্টি হলেই রাজধানীর বেশিরভাগ রাস্তায় হাঁটু ও কোমরসমান পানি জমে যায়। সাগরপাড়ের চট্টগ্রাম যেন সাগরের রূপ নেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আসন্ন বর্ষায় অল্প সময়ে অতি ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। বলা চলে এ বছরও ঢাকাসহ অনেক নগরী ‘ডুববে’ এমন শঙ্কা দূরে রাখা যাচ্ছে না।
অথচ চিত্রটি ভিন্ন হওয়ার কথা ছিল অন্তত ঢাকায়। এতদিন রাজধানীতে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে সিটি করপোরেশন ঢাকা ওয়াসাকে দায়ী করে আসছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত রাখতে হলে খালগুলোকে উদ্ধার করে টেকসই পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা ও এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ঢাকা শহরে বর্তমানে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ নানা উন্নয়নকাজ চলছে। এসব উন্নয়নকাজও অনেকক্ষেত্রে জলাবদ্ধতা তৈরি করে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পর যে নদীতে যাবে, তার নাব্যও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকার চারপাশের চারটি নদ-নদী- বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু এখন প্রায় মুমূর্ষু। প্রতিটি নদ-নদী মারাত্মকভাবে দখল ও দূষণের শিকার। ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার। রাস্তায়, পুকুরে, নদীতে যত্রতত্র পলিথিন ফেলে পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ করা হয়েছে। এ থেকে উত্তরের উপায় হলো পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করা। সেই সঙ্গে সব খাল, পুকুর, ডোবা, জলাশয় দখলমুক্ত করতে হবে।

আধুনিক নগরীতে জলাবদ্ধতার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকার জলাধার, জলাশয় হিসেবে ঝিল ও খালের কার্যকারিতা বিগত দশকগুলোতে ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে দখল ও দূষণের কারণে। এটি যে কত বড় অপরিণামদর্শিতা এবং আত্মঘাতী কার্যকলাপ সেটি নগরবাসী প্রতিবছরই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এর ফলে পরিবেশ দূষণ ঘটছে মারাত্মকভাবে। অপরদিকে বর্ষাকালে পানি ধরে রাখার পথ অবরুদ্ধ হওয়ায় জলাবদ্ধতা ও জলজট হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জন্য নিদারুণ প্রহসন। খালগুলো যেন ইচ্ছেমতো যত খুশি যেভাবে খুশি বর্জ্য ফেলার স্থান। সব মিলিয়ে ঢাকার অধিকাংশ খালই মরণ দশায় নিপতিত। এসব খাল ভরাট করে অবৈধভাবে বহুতল ভবন, দোকানপাট, বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন প্রভাবশালীরা। রাজধানীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত রাখতে হলে খালগুলোয় টেকসই পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। খালগুলোকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণও করতে হবে, যাতে কেউ দখল বা ভরাট করতে না পারে। একইসঙ্গে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাও আধুনিক করা অত্যাবশ্যক।

সর্বশেষ কথা থাকে, যেকোনো নগরীর জলাবদ্ধতার জন্য এর অধিবাসীরাও অনেকাংশে দায়ী। সরকার হাজার চেষ্টা করেও জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধান করতে পারবে না, যদি সাধারণ নাগরিকরা সচেতন না হয়। আমাদের ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনাই জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ- এ বোধটুকু নাগরিকদের মধ্যে থাকতে হবে; তাহলেই জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি উদ্যোগ সফলতা পাবে এবং আমরা পাব জলাবদ্ধতামুক্ত সুন্দর শহর। আরেকটি কথা যেকোনো নগরীর জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে সহায়ক। তাই অপ্রয়োজনে জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ থেকে দূরে থাকতে হবে আমাদের। বর্ষা মৌসুমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর-উপশহরগুলোতে প্রবল জলাবদ্ধতা কোনো নতুন সমস্যা নয়। মূলত পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও এ জলাবদ্ধতার জন্য আমরা সরকার, মেয়র তথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করে থাকি। আমরা যতই তাদের দায়ী করি না কেন-এ ব্যাপারে আমরাও কিন্তু কম দায়ী নই। কাজেই মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। তাই এক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

লেখক- সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading