দীনবন্ধু মিত্র: বাংলা নাটকের উজ্জ্বল অধ্যায়ের স্রষ্টা

দীনবন্ধু মিত্র: বাংলা নাটকের উজ্জ্বল অধ্যায়ের স্রষ্টা

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫

তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটকের শ্রেষ্ঠ রূপকার ছিলেন। দীনবন্ধু মিত্র হিন্দু সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রহসন রচনা করেও খ্যাতি অর্জন করেন। সমাজের সাধারণ মানুষ সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিই দীনবন্ধু মিত্রের রচনার প্রধান প্রেরণা। চাকরিসূত্রে দেশ-বিদেশ ঘুরে বহুলোকের সঙ্গে দীনবন্ধু মিত্রের পরিচয় হয়। সেই অভিজ্ঞতা তার নাটকের চরিত্র সৃষ্টিতে দীনবন্ধু মিত্র বিশেষভাবে সাহায্য করে। নীলদর্পনের স্রষ্ঠা দীনবন্ধু মিত্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল অনিক।

তার হাত ধরেই শুরু হয় বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নতুন অধ্যায়। বাংলা নাটক রাজপ্রাসাদ থেকে মুক্তি লাভ করে চলে আসে খেটে খাওয়া মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। নাট্য ইতিহাসে এই বিপ্লব ঘটে ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৭ তারিখে। তার রচিত নীলদর্পণ বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ নাটক হিসাবে আজো বিবেচিত ও সমাদৃত।

দীনবন্ধু মিত্র কে ছিলেন?
দীনবন্ধু মিত্র ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার। বাংলার আধুনিক নাট্যধারার প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমসাময়িক দীনবন্ধু মিত্র অবশ্য মাইকেল প্রবর্তিত পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক নাট্যরচনার পথে না গিয়ে বাস্তবধর্মী সামাজিক নাট্যরচনায় মনোনিবেশ করেন। এই ধারায় দীনবন্ধু মিত্রই হয়ে ওঠেন পরবর্তীকালের নাট্যকারদের আদর্শ স্থানীয়।

দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম
সাধারণ রঙ্গালয়ের স্রষ্টা, বৃহত্তর বাঙালির দরদী নাট্যকার ১৮৩০ সালে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। দীনবন্ধু মিত্রের পিতৃ প্রদত্ত নাম গন্ধর্বনারায়ণ। স্কুল জীবনে নিজেই নিজের নাম পাল্টে দীনবন্ধু করেন বলে অনেকের অনুমান।

দীনবন্ধু মিত্রের শিক্ষা ও কর্মজীবন
দীনবন্ধু মিত্র কিছুদিন এক গ্রাম্য স্কুলে লেখাপড়া করেন। পরে জমিদারী সেরেস্তার কাজে নিযুক্ত হন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পরে কলকাতায় চলে আসেন এবং লং সাহেবের অবৈতনিক ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলেই তিনি দীনবন্ধু মিত্র নাম ধারণ করেন। বলে অনেকের অভিমত। ১৮৫০ খ্রীঃ তিনি বৃত্তি লাভ করে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি সব পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন। কলেজের সকল পরীক্ষায় তিনি বৃত্তি লাভ করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। শেষ পরীক্ষা না দিয়ে পাটনায় ১৫ টাকা বেতনে পোস্টমাস্টারের চাকরি গ্রহণ করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের শিষ্যত্ব ও প্রথম কবিতা
ছাত্রাবস্থায় দীনবন্ধু মিত্র কবিতা লেখা শুরু করেন। সেই সূত্রে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং তিনি তার শিষ্যত্বও গ্রহণ করেন। ঈশ্বরগুপ্তের শিষ্যদের মধ্যে দীনবন্ধু মিত্রই সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। ঈশ্বরচন্দ্র সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সাধুরঞ্জন’ পত্রিকায় দীনবন্ধুর প্রথম কবিতা ‘মানব চরিত্র’ প্রকাশিত হয়।

উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ
দীনবন্ধু’র উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সুরধনী কাব্য এবং দ্বাদশ কবিতা অন্যতম। নাট্যকার রূপেই তার বিশেষ খ্যাতি, পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা। এছাড়া গল্প রচনায়ও দীনবন্ধু মিত্র মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

নাট্যকার রূপে আবির্ভাব
গল্প, কবিতা, উপন্যাস রচনায় সিদ্ধহস্ত হলেও দীনবন্ধু মিত্র মূলতঃ নাট্যকার হিসাবে দীনবন্ধু মিত্রের আবির্ভাবের ফলে সাধারণ রঙ্গালয়ের দ্বারোন্মোচন সহজে সম্ভব হয়ে ওঠে। শুরু হয় বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নতুন অধ্যায়। বাংলা নাটক রাজ প্রাসাদ থেকে মুক্তি লাভ করে চলে আসে খেটে খাওয়া মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। নাট্য ইতিহাসে এই বিপ্লব ঘটে ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৭ তারিখে।

রায়বাহাদুর উপাধি
বাগবাজার এ্যামেচার থিয়েটার ন্যাশনাল থিয়েটার নাম ধারণ করে রায়বাহাদুর দীনবন্ধু মিত্র বিরচিত বিখ্যাত নাটক ‘নীলদর্পণ” মঞ্চস্থ করে ঐ তারিখে। নীলদর্পণ মঞ্চস্থ করে ন্যাশনাল থিয়েটার যে জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা লাভ করে তা বাংলা নাট্যরচনা ও মঞ্চচর্চাকে বিশেষ ও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ও উৎসাহিত করতে সমর্থ হয়। উল্লেখ্য, ইংরেজ সরকার দীনবন্ধু মিত্রকে ১৮৭১ সালে রায়বাহাদুর উপাধি প্রদান করে।

নীলদর্পণ বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ নাটক হিসাবে আজো বিবেচিত ও সমাদৃত। নীলকরদের বীভৎস অত্যাচার ও নির্যাতনে লাঞ্ছিত অপমানিত দেশবাসী ও চাষীদের দুরবস্থার এই নাটক তিনি লেখেন ১৮৬০ সালে। বাংলাদেশে বহুবার বহু মঞ্চে নাটকটি অভিনীত হয়েছে এবং হচ্ছে। নাটকটির আবেদন চিরায়ত। তার রচিত অন্য দুটি নাটক সধবার একাদশী, জামাই বারিক উচ্চাঙ্গের সামাজিক নাটক। ১৮৬১ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত নীলদর্পণ-এর ইংরেজি অনুবাদ করেন।

বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন— ইতাছের জন্য লং সাহেব। নীলদর্পণ প্রচারের জন্য লংসাহেব সুপ্রিম কোর্টের বিচারে দন্ডীয় থাকার নিমিত্ত হউক, নীলদর্পণ ইউরোপের অনেক ভাষায় অনুবাদিত হয়েছিল। এই সৌভাগ্য বাংলায় আর কোন গ্রন্থেই ঘটে নাই।

উল্লেখযোগ্য নাটক গুলি
দীনবন্ধু মিত্র তার আরো যেসব নাটকে সমকালীন রুচি ও জীবনবোধের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। তার মধ্যে নবীন তপস্বিনী, বিয়ে পাগলা বুড়ো, সধবার একাদশী, লীলাবতী, জামাই বারিক, কমলে কামিনী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

দীনবন্ধু মিত্রের মৃত্যু
এই মহান নাট্যকার ১৮৭৩ সালের ১লা নভেম্বর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading