মাইকেল ফ্যারাড: তার আবিষ্কারে মানবসভ্যতা পায় নতুন দিকপ্রদর্শক
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৮ মে ২০২২ । আপডেট ১২:২০
পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে মাইকেল ফ্যারাডে অন্যতম। এলবার্ট আইনস্টাইন তার পড়ার ঘরের দেয়ালে কেবল তিনজনের ছবি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন– আইজ্যাক নিউটন, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, মাইকেল ফ্যারাডে। মহান বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড ফ্যারাডেকে নিয়ে বলেছিলেন, “এই লোকটাকে যত বড় সম্মানই দেয়া হোক না কেন, সেটা যথেষ্ট নয়।” ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিজ্ঞানী, আবিষ্কারক মাইকেল ফ্যারাডের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
তিনি ছিলেন সরল, উদার, নিরহঙ্কারী ও ধর্মভাবাপন্ন মানুষ। অর্থ এবং সম্মানের বিষয়ে কোনদিনই লালায়িত ছিলেন না। তার জীবনযাত্রা ছিল অতি সাধারণ অনাড়ম্বর। তার আত্মমর্যাদাবোধ এতই প্রখর ছিল যে বৃদ্ধ বয়সে চরম অর্থসঙ্কটের সময়েও -পেনসন গ্রহণ করতে সম্মত হননি। অথচ তারই আবিষ্কারের সুবাদে ইংলন্ড সেই সময় উপার্জন করছিল কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
সংক্ষেপে মাইকেল ফ্যারাড
মাইকেল ফ্যারাডে একজন ইংরেজ রসায়নবিদ এবং পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন। তড়িচ্চুম্বক তত্ত্ব এবং তড়িৎ রসায়নের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যে, চুম্বকত্ব আলোকে প্রভাবিত করে এবং এই দুই প্রত্যক্ষ ঘটনার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্ক রয়েছে। তার আবিষ্কারের প্রধান বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে তড়িচ্চুম্বক আবেশ, ডায়াম্যাগনেটিজম, তড়িৎ বিশ্লেষণ।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে তার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে মানবকল্যাণে তার অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য। ফ্যারাডের অক্লান্ত সাধনাকে ভিত্তি করে আবিষ্কৃত হয়েছিল ডায়নামো যা বিশ্বের শিল্পক্ষেত্রে নিয়ে এসেছিল বিপ্লব। মানবসভ্যতার ক্ষেত্রে যা হয়ে উঠেছিল এক নতুন দিগ্দর্শক স্বরূপ।
মাইকেল ফ্যারাডে’র জন্ম ও পরিচয়
১৭৯১ খ্রিঃ ২২ শে সেপ্টেম্বর ইংলন্ডের নেউইংটনে এক দরিদ্র কর্মকার পরিবারে জন্ম হয়েছিল এই অসাধারণ প্রতিভাধর বিজ্ঞানীর। দারিদ্র্য উন্নতিকামী জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রাস করে নেয়। আর্থিক অনটনের জন্য ফ্যারাডে বাল্যকালে স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। যেটুকু লেখাপড়া তা হয়েছিল বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে।
মাইকেল ফ্যারাডে’র ছোটবেলা
প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে অর্থোপার্জনের জন্য চাকরি নিতে হয়েছিল এক বই – এর দোকানে। এখানে তাকে বই বিক্রি এবং বই বাঁধাই দুটি কাজই করতে হত। পরিশ্রম সাপেক্ষ কাজ হলেও মনের তৃপ্তি নিয়েই তিনি করতেন। কেন না পছন্দমত বিষয়ের বই পড়ার সুযোগ ছিল এখানে। যখনই সময় পেতেন, কখনো কখনো সারারাত জেগে তিনি বই পড়ে অতৃপ্ত মনের ক্ষুধা মেটাতে লাগলেন।
ফ্যারাডে বেশি আনন্দ পেতেন বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ের বইগুলি পড়ে। তিনি বুঝতে পারতেন এদিকেই তার সহজাত আকর্ষণ। বিজ্ঞানের যে বই হাতে পেতেন তাই নিয়েই ডুবে যেতেন। কিন্তু লেখাপড়া তো বেশি ছিল না। বিজ্ঞানের বেশিরভাগ তথ্যই তাই দুর্বোধ্য ঠেকত। বারবার পড়ে বুঝবার চেষ্টা করতেন। কোন বিষয় পরিষ্কার হয়ে যেত, কোন কোন বিষয় নিয়ে খুবই সমস্যায় পড়ে যেতেন। তার জানার আগ্রহ এমনই তীব্র ছিল যে এই দুর্বোধ্যতা মোচনেরও একটা পথ বার করে নিয়েছিলেন তিনি।
মাইকেল ফ্যারাডে র কর্ম জীবন
বিজ্ঞানের প্রতি অন্তরের আকর্ষণ এই দুই ব্যক্তিত্বকে সম্পর্কযুক্ত করল। ডেভির ডাক পেয়ে মুহূর্ত বিলম্ব করলেন না ফ্যারাডে। পুনরায় তার সমস্যার কথা খুলে জানালেন ডেভিকে। তার প্রতিভার পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হলেন ডেভি। জ্ঞানের গভীরতার সন্ধান পেয়ে চমৎকৃত না হয়ে পারলেন না। ফ্যারাডের কৌতূহল চরিতার্থ করবার সুযোগ নিজেই করে দিলেন ডেভি।
হ্যামফ্রে তাকে গ্রহণ করলেন তার সহকারী রূপে। কেবল তাই নয় তার প্রতিভা বিকাশের সবরকম ব্যবস্থা করে দিলেন। কোন বিষয়ে ডেভি যখন গবেষণা করতেন, তিনি ফ্যারাডেকে পাশে রাখতেন। কাজের ফাকে ফাকে তাকে শিক্ষা দিতেন। বিদেশে যখন বক্তৃতা দিতে যেতেন ফ্যারাডেকে সঙ্গী করতেন। ডেভির সাহচর্য ও ঐকান্তিক চেষ্টায় বিজ্ঞানী ফ্যারাডে র জন্ম হল। রসায়ন বিজ্ঞান নিয়ে ডেভির সঙ্গে একসময় গবেষণা আরম্ভ করলেন।
পরে ১৮১৬ খ্রিঃ থেকে ডেভির উৎসাহে ফ্যারাডে স্বাধীনভাবে গবেষণা আরম্ভ করলেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী উরস্টেড ১৮২০ খ্রিঃ চুম্বকও তড়িৎ প্রবাহ নিয়ে গবেষণা করলেন। তার গবেষণার ব্যাখ্যা শুনে ফ্যারাডে তড়িৎ – চুম্বক বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। ১৮২৯ খ্রিঃ থেকে তিনি এবিষয়ে গবেষণা আরম্ভ করলেন। ১৮৩১ খ্রিঃ পর্যন্ত তিন বছর গবেষণা করার পর তিনি আবিষ্কার করলেন তড়িৎ চৌম্বক আবেশের নিয়মগুলি।
তিনি প্রমাণ করলেন একটি চুম্বক বা তড়িদ্বাহী বর্তনীর সাহায্যে অন্য একটি বর্তনীতে ক্ষণস্থায়ী তড়িৎচালক বল সৃষ্টি করা সম্ভব। ফ্যারাডের এই আবিষ্কার তড়িৎ বিজ্ঞানে এক সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার সুত্রপাত ঘটাল ৷ পরবর্তীকালে জেনারেটর, ট্রানসফরমার প্রভৃতি প্রয়োজনীয় তড়িৎ – যন্ত্রের উদ্ভাবন হয়েছে ফ্যারাডের সূত্র অনুসারেই। এই আবিষ্কারই ফ্যারাডেকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর সম্মান এনে দিল।
পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান সংস্থা লন্ডনের রয়াল সোসাইটি ফ্যারাডেকে প্রথম সম্মান জানাল। স্কুল কলেজের শিক্ষাবিহীন এক ব্যক্তি ফ্যারাডে, তিনি বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞান সংস্থার লেকচারার নিযুক্ত হলেন। এ এক অসাধারণ, অস্বাভাবিক বিরল ঘটনা সন্দেহ নেই। ফ্যারাডের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল তরলের তড়িৎ বিশ্লেষণের নিয়মাবলী। তড়িৎ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলিও অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের একটি নতুন দিকের প্রতি আলোকপাত করতে সক্ষম হয়েছিলেন ফ্যারাডে। তার দ্বিতীয় আবিষ্কারের ফলে তড়িৎ রসায়নবিদ্যা নামক রসায়নের অপর একটি শাখা নিয়ে গবেষণার পথ উন্মুক্ত হল। ফ্যারাডের আবিষ্কারের সংখ্যা বহুবিধ। তার মধ্যে চৌম্বক ক্ষেত্রে অলোকের পরিবর্তন, ক্লোরিন গ্যাসকে তরলে রূপান্তরকরণ এবং বেনজিন নামক কার্বন ও হাইড্রোজেনের একটি যৌগিক পদার্থ প্রভৃতি তিনটি আবিষ্কার ফ্যারাডে এফেক্ট নামে পরিচিত।
এই তিনটি আবিষ্কারের প্রত্যেকটির মধ্যেই নিহিত ছিল নতুন নতুন সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি। চৌম্বকক্ষেত্রে আলোকের পরিবর্তন বিষয়ে পরীক্ষার ফলাফল ভিত্তি করেই ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বেতার তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছিলেন। অতি সাধারণ অবস্থা থেকে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি অধ্যবসায় ও নিষ্ঠা বলে বিজ্ঞানের ইতিহাসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন ফ্যারাডে।
মাইকেল ফ্যারাডে’র মৃত্যু
১৮৬৭ খ্রিঃ ২৫শে আগষ্ট এই স্বয়ংসৃষ্ট মহান বিজ্ঞানীর জীবনাবসান হয়। মারা যাওয়ার পর তাকে লন্ডনের হাইগেইট সেমেটারিতে কবর দেয়া হয়।
ইউডি/অনিক

