১১ বছর ধরে অপক্ষোয় বাংলাদেশ : তিস্তা চুক্তি হবে তো?
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ৩১ মে ২০২২ । আপডেট ১২:২৫
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইন্ডিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অনেক মজবুত। দুদেশের মধ্যে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক চুক্তি সই হলেও ১১ বছর ধরে এখনও আলোর মুখ দেখেনি বহুল প্রতিক্ষীত ও আলোচিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। বারবার দুদেশের শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা গুরুত্ব পেলেও এখনও এই চুক্তি নিয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন তাই এই বিষয়টিকে লজ্জাজনক বলেই মন্তব্য করেছেন। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির।
ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর পানি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক এই নদীর পানির ন্যায্য পাওনা নিশ্চিতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ইন্ডিয়ার কাছ থেকে এখনও কোনো সমাধান না আসায় ১১ বছর ধরে অপেক্ষায়ই করছে বাংলাদেশ। আর এই বিষয়টিকে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। সম্প্রতি ইন্ডিয়ার আসামের গুয়াহাটিতে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের মধ্যে নদী কনফারেন্স শুরু হয়। দু’দিনব্যাপী এই সম্মেলনে অংশ নেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে ইন্ডিয়ার একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি এই তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন প্রসঙ্গ ব্যাখা করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমরা খুব আশাবাদী যে ইন্ডিয়া চুক্তির সাথে এগিয়ে যেতে রাজি হবে, এমনকি পশ্চিমবঙ্গও সম্মত হবে, এবং আমরা এটি সম্পন্ন করতে পারবো।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের স্বার্থ এবং সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ
২০১১ সালে ইন্ডিয়া তিস্তা নদীর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পানি বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে সম্মত হয় এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ পানি ধরে রাখতে সম্মত হয় দেশটি। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের এই মুখ্যমন্ত্রী শুরু থেকেই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশের পানি বণ্টনের মীমাংসা শুধু দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়, এক্ষেত্রে ইন্ডিয়ার রাজ্য সরকারের স্বার্থ এবং সম্মতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় রাজনীতিরও এখানে প্রভাব রয়েছে। তারা বলেছেন, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে থেকে রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ে যে ধরনের সংলাপ বা আলোচনার প্রয়োজন, সেটি যথাসময়ে করা সম্ভব হয়নি, এছাড়া সবপক্ষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা যায়নি। যে কারণে অভিন্ন নদীর পানি সংক্রান্ত ছোটখাট বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকতে দেখা যায়। তারা বলছেন, দুই দেশই আমাদের পানির দক্ষ ব্যবহার করতে পারি, আমরা দুই দেশে অববাহিকা ভিত্তিক সামগ্রিকভাবে নদী ব্যবস্থাপনাকে যদি চিন্তা করি, তাহলে দেখা যাবে যে, এরকম অনিশ্চয়তা এবং দুশ্চিন্তা আমরা দূর করতে পারবো।

নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনা দুদেশের জন্যই মঙ্গলজনক
দীর্ঘ ১১ বছর ধরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি আটকে থাকার বিষয়ে ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, এটা লজ্জাজনক। আমরা প্রস্তুত ছিলাম, তারাও প্রস্তুত ছিল, কিন্তু সেই চুক্তি করা হয়নি। ভবিষ্যতে পানির জন্য বড় ধরনের হাহাকার দেখা দেবে এবং এর জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমরা গত ১১ বছর ধরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করতে পারিনি। ইন্ডিয়ার সঙ্গে আমাদের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। আমরা সকল নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানি ভাগাভাগিসহ একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। মূলত উভয় দেশের নদীর পাড়ের মানুষের মঙ্গলের জন্যই যৌথ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসাম ও বাংলাদেশ একই সময়ে বন্যার সম্মুখীন হয়েছে। আর তাই পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রযুক্তির আরও সহযোগিতা নিতে হবে আমাদের। যৌথভাবে বন্যার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।
ড. মোমেন বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনে মাত্র ৩ শতাংশ, ইন্ডিয়ায় মাত্র ৬ শতাংশ মানুষের জীবনযাপন নদীর কারণে প্রভাবিত হয়। তবে নিচু এলাকা হওয়ায় আমাদের ২৩ শতাংশ মানুষ ও তাদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত হয়ে থাকে। এককভাবে একটি দেশের আন্তঃসীমান্ত নদীর বিষয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন করা উচিত নয়। আমাদের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বাসিন্দাদের সবার একসঙ্গেই দেখা উচিত, সেটি চীনের উন্নয়ন হোক বা ইন্ডিয়া বা বাংলাদেশের। আমাদের সবাইকে সমগ্র অববাহিকা এবং এর জনগণের ওপর প্রভাব নিয়ে ভাবতে হবে।

তিস্তা নিয়ে চীনের প্রস্তাব বেশ লাভজনক
তিস্তা নদীর ওপর ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে আলোচনা করছে বলে গণমাধ্যমে অনেক গুঞ্জন রয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য নদী অববাহিকাকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা এবং গ্রীষ্মকালে পানির সংকট মোকাবিলা করা। এ বিষয়ে গণমাধ্যমটিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের কাছে এখনও তিস্তা নিয়ে চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব আসেনি। চীন যেটি প্রস্তাব করছিল তা প্রাথমিকভাবে একটি ফরাসি প্রকল্প ছিল, ১৯৮৯ সালে ফরাসি প্রকৌশলীরা একটি নকশা করেছিলেন। এটা অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় সেই সময় আমরা তা বহন করতে পারতাম না। এখন চীনারা সেই তিস্তা প্রকল্পের একটি অংশ নিতে চাচ্ছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এটা নিয়ে কোনো প্রস্তাব পাঠায়নি। এটা কিভাবে সামনে এগোয় সেটি আমাদেরকে দেখতে হবে। কারণ তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যা সমাধানে এখন পর্যন্ত ইন্ডিয়া আসলে তেমন কিছুই করছে না। সে কারণেই চীন একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। আর এটা বেশ লাভজনক প্রস্তাব।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের সুবিধার জন্য তিস্তাকে আরও ভালোভাবে পরিচালনা করার জন্য একটি প্রযুক্তিগত সমীক্ষা চালানোর জন্য পাওয়ারচিনা বা চায়না পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তবে, তিস্তা একটি অমীমাংসিত ইস্যু। তাই আমাদের জনগণ স্বাভাবিকভাবেই সরকারকে নতুন কোনো প্রস্তাব (সমাধান) ভেবে দেখার জন্য চাপ দেবে। এই কারণেই হতে পারে তিস্তার ওপর চীনা প্রকল্প নিয়ে গণমাধ্যমগুলোতে এত আলোচনা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের মধ্যেই ঢাকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নেওয়ার চেষ্টা করছে ইন্ডিয়া। ঢাকা ও নয়াদিল্লি জুন মাসে উভয় পক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক যৌথ পরামর্শমূলক কমিশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এটাই জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ইন্ডিয়া সফরের পথ খুলে দেবে।

যৌথ নদীগুলোর পানির ন্যায্যতা নিশ্চিত করা চাই
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তার বয়স ২৩৪ বছর। কিন্তু এই নদী নিয়ে এখন পর্যন্ত যৌথ কোনো সমীক্ষা হয়নি। তিস্তা ১০ হাজার কিউসেক পানি ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেখানে ওই পরিমাণে পানি শুষ্ক মৌসুমে আসে না। তিস্তায় এখন ধুলার স্তর তৈরি হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন করতে হবে। এই পানি আটকে রাখলে, তা সম্ভব নয়। এই পানি ইন্ডিয়া আটকে না রাখলে, তা বঙ্গোপসাগরে চলে যেত। বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশনে স্বাক্ষর করে তিস্তার মতো যৌথ নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা।
তারা বলছেন, সমঝোতার প্রধান শর্ত হচ্ছে, আপনি কি সংঘাত, না সমঝোতা করবেন। তিস্তা নদী নিয়ে সমঝোতার বিকল্প নেই। ইন্ডিয়ার সঙ্গে যেকোনো সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। রাষ্ট্র থেকে বিষয়গুলোকে জনগণের স্তরেও নামিয়ে আনতে হবে। যৌথ নদী কমিশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড যে পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। এখনকার নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে না। তাই আমাদের এ জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তির পর আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি। বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টনের বিষয়টির সূত্রপাত হয় ১৯৮৩ সালের আগস্ট মাসে দুদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্ডিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফর করেন। সে সময় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। অন্তর্র্বতীকালীন সেই চুক্তি সময়কাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর। এ চুক্তি অনুসারে তিস্তা নদীর পানির ৪২.৫ শতাংশে ইন্ডিয়ার অধিকার ও ৩৭.৫ শতাংশ বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্ডিয়া সফর করেন। তার ইন্ডিয়া সফরকে ঘিরে আশা তৈরি হয় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের। সফরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু তখনও সম্মতি জানাননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তার অসম্মতি জানানোর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি বলেন উত্তরবঙ্গের মানুষকে বঞ্চিত করে তিনি বাংলাদেশকে পানি দিতে রাজি নন। এমনকি ২০১৫ সালে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঢাকা সফরে আসেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ সময়ে তিস্তার চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক বক্তব্য রাখলেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
ইউডি/অনিক

