উইলবার-অরভিল রাইট: দুই ভাইয়ের উড়োজাহাজ আবিষ্কারের অজানা গল্প
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ৩১ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ১৭ই ডিসেম্বর আকাশ অভিযানের ইতিহাসে একটি লাল অক্ষরে লিখে রাখার দিন। সেদিনই মানুষ প্রথম তার আকাশে ভেসে থাকার স্বপ্নকে সফল করেছিল। দুই মহান বিজ্ঞানীর নাম জড়িয়ে আছে এই অভিযানের সঙ্গে। তারা হলেন রাইট ভ্রাতৃদ্বয়— উইলবার এবং অরভিল রাইট। অরভিল ও উইলবার রাইট এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডোয়াইট ডি. আইজেন ১৯৫৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ১৭ ডিসেম্বর দিনটিকে রাইট ব্রাদার্স দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। আমেরিকানরা বেশ আয়োজন করেই এই দিনটি পালন করেন। তবে এটি সে দেশের কোনো সরকারি ছুটির দিন নয়। সেদিন ওয়াশিংটন ডিসিতে রাইট ব্রাদার্স মেমোরিয়াল ট্রফি প্রদান করা হয়।
অরভিল ও উইলবার রাইট কে ছিলেন?
উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট ছিলেন দু’জন মার্কিন প্রকৌশলী, যাদের উড়োজাহাজ আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তারা ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রথম নিয়ন্ত্রিত, শক্তিসম্পন্ন এবং বাতাসের চাইতে ভারী সুস্থিত মানুষ-বহনযোগ্য উড়োজাহাজ তৈরি করেন। পরবর্তী দু’বছর তারা তাদের উড়ন-যন্ত্রটিকে অনড়-পাখাবিশিষ্ট উড়োজাহাজে রূপান্তরিত করেন। পরীক্ষামূলক বিমানপোত নির্মাণে সর্বপ্রথম না হলেও, উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট আবিষ্কৃত উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রকের সাহায্যই প্রথম অনড়-পাখাবিশিষ্ট উড়োজাহাজ নির্মাণ সম্ভবপর হয়।
রাইট ব্রাদার্সের জন্ম ও শৈশবকাল
ছোট্টবেলা থেকেই তারা যন্ত্রপাতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতেন। জন্মেছিলেন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা প্রদেশে। উইলবারের জন্ম ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে। ছোটো ভাই অরভিল পৃথিবীর আলো দেখেন তার চার বছর বাদে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে।
চার বছরের তফাত থাকলে কী হবে, হঠাৎ দেখলে মনে হত তারা দুটি যমজ ভাই। একে অন্যকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকতে পারতেন না। নিজেরাই নানা যন্ত্রের মডেল তৈরি করতেন। ভীষণ ধৈর্য ছিল তাদের দুজনেরই। আর ছিল উৎসাহ। স্কুলের পড়া শেষ হলে দৌড়ে বাড়িতে চলে আসতেন। আর তারপর খাওয়া ঘুম ভুলে লেগে থাকতেন ওই কাজে।
রাইট ব্রাদার্সের শিক্ষাজীবন
স্কুলের পড়াশোনাতে খুব একটা ভালো ফল দেখাতে পারেননি তারা। মোটামুটিভাবে পাশ করতেন। দেখাবেন কী করে? পাঠক্রমের বোঝা মাথার ওপর চেপে বসেছে। এর থেকে তাদের যে অনেক ভালো লাগে হাতে কলমে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে, যন্ত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে। আর, কলেজে এসে তাই করতে শুরু করলেন ওরা দুজন। কলেজের পড়া বেশিদূর এগোতে পারেননি তারা। কেননা, দিন থেকে রাত কেটে যাচ্ছে শুধু পরীক্ষা করতে করতে। প্রথমে ছাপার যন্ত্র, তারপর বাইসাইকেল নিয়ে নানা গবেষণা করেছিলেন তারা।
রাইট ব্রাদার্সের গবেষণা
তখন অটো লিলিয়েনথাল নামে এক জার্মান ইঞ্জিনিয়ার গুপ্ত যান নিয়ে গবেষণা করছেন। বেশ কিছুটা অগ্রসর হয়েছিলেন তিনি এই পথে। হঠাৎ তার মৃত্যু হল। গবেষণা সেখানেই থেমে গেল। রাইট ভাইয়েরা ভাবতে থাকলেন, লিলিয়েনথালের পথ ধরে এগিয়ে গেলে কী হয়! লিলিয়েনথালের উড়ন্ত যানের নকশা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে করতে তারা এর কয়েকটি সম্ভাব্য ক্রটিকে চিহ্নিত করেছিলেন। এবার শুরু হল ত্রুটি পরিশোধনের কাজ।
দুই ভাই স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সত্যি সত্যি মানুষ পাখির মতো আকাশে ভাসবে। সেদিন আর তাকে তাকিয়ে থাকতে হবে না নীল আকাশের দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে না। বলতে হবে না– হায় খোদা, তুমি কেন আমাকে দুটি পাখনা দিলে না? আমার বড়ো সাধ জাগে উড়তে উড়তে চলে যাব অচিন দেশে।
রাইট ব্রাদার্স এর আবিষ্কার
১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে উইলবার পাঁচ ফুট উচ্চতার একটি বাক্স ঘুড়িতে পাখা বেঁধে ওড়ার চেষ্টা করেন। পরের বছরই তারা গ্লাইডার তৈরি করেন। এটিকে ওড়ানোর জন্য আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হকে নিয়ে আসা হয়। উড্ডয়নটি মাত্র ১২ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। তাতে অবশ্য তারা দমে যাননি। এরপর ১৯০১ এবং ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে পরপর দুটি পরীক্ষা করেন। তৃতীয়বার তারা নিজেদের উদ্ভাবিত যন্ত্র ব্যবহার করে কিছুটা সাফল্য পান।
প্রায় এক হাজার বার এটি ওড়ানো হয়। এর নাম দেন ‘ফ্লাইয়ার-১’। ১৯০৩-এর ২৩ মার্চ রাইট ভ্রাতৃদ্বয় উড্ডয়নকৃত গ্লাইডারের প্যাটেন্ট লাভের জন্য আবেদন করেন। এরপর তারা সাধনা অব্যাহত রেখে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন ফ্লাইয়ার-১১১। এটিতে তারা ১০৫ বার উড্ডয়ন করেন। এ ঘটনা পৃথিবীর সকল গণমাধ্যম বিশেষ করে আমেরিকার বিখ্যাত ‘হেরল্ড ট্রিবিউন’ পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়।
তাদের আবিষ্কার আজ আমাদের কাছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। আজকের ইস্পাতের পাখি তার থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। আজ শব্দের থেকে দ্রুতগামী এরোপ্লেন চোখের নিমেষে লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক পৌঁছে যাচ্ছে। কনকর্ড বিমান কত সহজে মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছে দূর থেকে দূরান্তরে। জাম্বোজেট একসঙ্গে ৩৫০ জন যাত্রী বহন করছে। সেইসব বিমানের বিলাস এবং আভিজাত্যও দেখবার মতো!
রাইট ব্রাদার্স এর মৃত্যু
রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ছিলেন চিরকুমার। ব্যস্ততার কারণে তাদের দুজনের বিয়ে করা হয়নি। উইলবার রাইট ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে পরলোক গমন করেন ও অরভিল রাইট ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে এই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন। তবুও প্রতিটি টেক অফের সময় আমরা স্মরণ করি উইলবার এবং অরভিলকে। তারা না থাকলে মানুষ বোধহয় আজও মাটিতে হেঁটে বেড়াত, আর তাকিয়ে থাকত আকাশের দিকে অবাক চোখে।
ইউডি/অনিক

