চালের বাজারে অস্থিরতা: প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০১ জুন ২০২২ । আপডেট ১০:৩০
দেশে এখন চলছে বোরো ধানের ভরা মৌসুম। প্রতিবছর এসময় চালের দাম কমতির দিকে থাকলেও এবার চিত্র উল্টো। বাজারে চালের সরবরাহ নেই। নানা অজুহাতে বাড়ছে চালের দাম। ধান-চালের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঠে নামছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আটটি টিম। এরআগে ভরা মৌসুমে চালের দাম এত বেশি কেন, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক
দেশে বোরো মৌসুমে বছরের চাহিদার অর্ধেকের বেশি চাল সংগ্রহ হয়। বাজারে চাল উঠতে শুরু করলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম কমে। কিন্তু এবার চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। বাজারে বোরো ধানের চাল আসার পরও দাম হুহু করে বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিবস্তা (৫০ কেজি) চালের দাম সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে। এতে বাজারে পণ্যটি কিনতে ভোক্তা দিশেহারা হয়ে পড়ছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর শুধু মিলারদের কারসাজিতে বাজারে চালের দামে অস্থিরতা দেখা দিত। এবার মিলারদের সঙ্গে বড় কিছু কোম্পানি সুযোগ নিচ্ছে। তারা মাঠে ধান পাকার আগেই কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে রেখেছেন। সেই ধান পাকার পরও তাদের গুদামে মজুত করছেন। পরিস্থিতি বুঝে তারা চাল বাজারে ছাড়ছেন। এতে বাজারে ধান সংগ্রহে কিছুটা সংকট দেখা দেওয়ায় মিলাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। যা সরাসরি ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, হাওড়ে বন্যায় ৮০ হাজার টন চাল নষ্ট হওয়ার পরও এ বছর বোরো উৎপাদনের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ১১ লাখ ৫৭ হাজার টন। আমেরিকার কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) বৈশ্বিক দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে গত বছরের তুলনায় এ বছর দেড় লাখ টন চাল বেশি উৎপাদিত হবে। এমন চিত্রের পরও বাজারে চালের দাম বাড়ছে।
অ্যাকশনে যাওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
ভরা মৌসুমে বাড়ছে চালের দাম। এক মাসের ব্যবধানে মান ভেদে প্রতি কেজি চালের দাম ৫-১৫ টাকা বেড়েছে। এ অবস্থায় চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে অ্যাকশনে যেতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কেউ অবৈধভাবে চাল মজুত করলে ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গত সোমবার (৩০ মে) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ নির্দেশ দেন তিনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কেন এ ভরা মৌসুমে চালের দাম এত বেশি থাকবে? কিছুদিন আগে তেলের ইস্যুতে যেরকম ড্রাইভ (অভিযান) দেওয়া হলো, তো ওরকম ড্রাইভ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যদি কেউ আন-অথোরাইজড চাল ব্যবসা করে বা মজুত করে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই ভরা মৌসুমে চালের কেন দাম বেশি, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার কিছু রিপোর্ট এবং সাজেশন ছিল। এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আমাদের মার্কেট সার্ভে করে দ্রুত অ্যাকশনে যেতে বলা হয়েছে। কোথায়-কোথায় চাল কে স্টক করে, আমাদের কাছে কিছু তথ্য আছে।

অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
এরআগে গত সোমবার খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছিলেন, অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যা করণীয় তার সবই করা হবে। ওই সময় তিনি ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত লাভ না করে ভোক্তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান। বিভিন্ন কর্পোরেট হাউস বাজার থেকে ধান-চাল কেনায় লিপ্ত হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তারা কৃত্রিম কোনো সংকট তৈরি করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে। ভোক্তা যেন আতঙ্কিত না হয়, সেজন্য সচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি ধান-চালের বাজারে নজরদারি বাড়াতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেন তিনি।
তিনি আরও বলেছিলেন, ধান কিনে মজুত করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। সবাই প্রতিযোগিতা করে ধান কিনছে, ভাবছে ধান কিনলেই লাভ। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা ভালো পরিণতি আনবে না। অধিকাংশ মিল মালিক বাজার থেকে ধান কিনলেও তারা উৎপাদনে যাচ্ছেন না। বাজারে নতুন চাল এখনও আসছে না। এখন বাজারে যে চাল পাওয়া যাচ্ছে তা গত বছরের পুরোনো। তাহলে নতুন ধান যাচ্ছে কোথায়?
অবৈধ মজুতের তথ্য জানাতে মাঠে ৮ টিম
ধান ও চালের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার (৩১ মে) থেকে মাঠে নেমেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ৮টি টিম। একইসঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। অবৈধ মজুতের তথ্য জানাতে কন্ট্রোল রুমের +৮৮০২২২৩৩৮০২১১৩, ০১৭৯০-৪৯৯৯৪২ এবং ০১৭১৩-০০৩৫০৬ নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধান-চালের অবৈধ মজুত ঠেকাতে মঙ্গলবার থেকেই মাঠে নেমেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ৮টি টিম। কেউ অবৈধ মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কিনা, এসব টিমের সদস্যরা তা খতিয়ে দেখবে এবং অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে কাজ করবে। অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) আধা-সরকারি চিঠি পাঠানো এবং এনএসআই, র্যাব ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকেও এ বিষয়ে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া শিগগিরই কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত সভা আয়োজন করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন খাদ্যমন্ত্রী।
মার্কেটে অভিযানে পালালেন চাল ব্যবসায়ীরা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযানে আসার খবরে পালিয়েছেন চাল ব্যবসায়ীরা। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মেট্রো) ফাহমিনা আক্তারের বারবার অনুরোধেও তারা দোকানে ফেরেননি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কৃষি মার্কেটে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি টিম। এ সময় মূল্য তালিকায় অসংগতি থাকায় এসএম রাইস এজেন্সি ও আনোয়ার ট্রেডার্স নামে দুই চালের দোকানকে চার হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফাহমিনা আক্তার বলেন, আমরা আজ (গতকাল) এসেছি চালের দাম কেন বেড়েছে সেটার খোঁজ নিতে। আমাদের আসার খবরে অনেক চাল ব্যবসায়ী দোকান থেকে পালিয়ে যান। পরে তাদের অনেক অনুরোধ করা হলেও তারা দোকানে ফিরে আসেননি। শুধু চালের বাজার নজরদারি করছি না মিল মালিকদের নজরদারিতে রাখার জন্য আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। আশা করি চালের দাম কমে আসবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মিল থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের বেচাকেনার রসিদ দেখা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
দায়সারা বক্তব্য মিল মালিকদের
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অটো রাইস মিল মালিকরা চাল মজুত করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভরা মৌসুমেও বাজারে চালের সরবরাহ নেই। আগের অর্ডারের চালও ঠিকঠাক মতো পাচ্ছেন না তারা। চালের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এছাড়া সম্প্রতি বেশ কিছু কোম্পানি প্যাকেটের মাধ্যমে চাল বিক্রি করায়, বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে বলেও দাবি তাদের। অন্যদিকে, মিল মালিকরা বলছেন, মিল পর্যায়ে নতুন করে চালের দাম বাড়ানো হয়নি। বৈরি আবহাওয়ার কারণে কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে ধান কিনতে হচ্ছে। এ বছর ধানের ফলন কম হওয়ায় দাম বাড়ছে বলেও দাবি তাদের।
এদিকে খাদ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে। চালের ভরা মৌসুমেও আড়ৎ অনেকটাই ফাঁকা। অস্থিতিশীল বাজারে হঠাৎ করে চালের দাম কেজি প্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নানা অনিশ্চয়তায় চাল কিনতে পারছেন না পাইকারী ব্যবসায়ীরা। তাই ভরা মৌসুমেও গুদাম ফাঁকা রাখতে হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ধান উৎপাদন মৌসুমে চালের বাজার অস্থির। কিন্তু এটা হওয়ার কথা ছিল না। কেন এমন পরিস্থিতি হয়েছে তা বের করতে হবে। বিশ্ববাজারের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে চালের বাজার অস্থির করতে না পারেন সেদিকে নজর রাখতে হবে। কোনো অনিয়ম পেলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

দেশের বিভিন্ন এলাকার মোকামে চালের দাম বেড়েছে। শুধু দিনাজপুর ও কুষ্টিয়া নয় এ চিত্র এখন দেশের সবর্ত্র। আমাদের দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চাল; বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষকে প্রচুর পরিমাণে ভাত খেতে হয় শুধু শর্করার চাহিদা পূরণের জন্য নয়, তাদের আমিষেরও একটা বড় অংশ আসে ভাত থেকে। তাই চালের দাম যেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়সাধ্যের সীমা অতিক্রম না করে, সরকারকে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। চালের বাজার স্বাভাবিক রাখতে সম্প্রতি নেয়া সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে কার্যকর হবে বলেই আশা রাখি।
ইউডি/সুস্মিত

