ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল: বিশ্ব মোড়লদের হটকেক
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১১:৫৫
বিশ্বে সামরিক-অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমেরিকার প্রভাব কী সেই আগের মতোই আছে। বিশ্লেষকদের মতে আমেরিকাকে চাপে ফেলছে চীন ও রাশিয়া। সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব পরিস্থিতি এমনিতেই বেসামাল। তার ওপরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে চীনের বেশ ক’টি নতুন চুক্তি বাড়াচ্ছে উত্তেজনা। চীনের এই অঞ্চল ঘিরে কর্তৃত্ব ঠেকাতে আমেরকিা ঢাল হিসেবে ‘কোয়াড’ নিয়ে নেমেছে বেশ আঁটসাটে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সমুদ্র রাজনীতি এখন বিশ্ব মোড়লদের জন্য হটকেক। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস
এখন বিশ্বজুড়ে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের খেলায় মত্ত্ব ক্ষমতাশালী দেশগুলো। এসব দেশের রয়েছে আধুনিক অস্ত্রসম্ভার, কারিগরী দক্ষতা, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ইত্যাদি। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে তারা। আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া। এই আধিপত্য ধরে রাখার প্রতিযোগিতা আজ থেকে শুরু হয়নি। আমেরিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের। সিই সময়ে স্নায়ুযুদ্ধ মানুষ ভুলে যায়নি। যদিও এখন চিত্রটা ভিন্ন। কারণ উন্নত দেশগুলো সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখছে এবং একইসঙ্গে নৌ, সমুদ্র ও আকাশপথে নিরাপত্তা জোরদার করছে। গত কয়েক বছরে চীন বিশ্বের পরাশক্তির কাতারে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্পষ্ট। ফলশ্রুতিতে কৌশল হিসেবে মিত্রদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজ বলয়ের প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছে আমেরিকা।
চীন-রাশিয়াকে নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছে আমেরিকা : এদিকে চীন ও ইন্ডিয়া নিজেদের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত। এ ক্ষেত্রে আমেরিকা এ অঞ্চলে মিত্র হিসেবে ইন্ডিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু এখন এসব ছাড়িয়ে চীনের আধিপত্য বেশি লক্ষণীয়। আমেরিকার সঙ্গে চীনের বাণিজ্য যুদ্ধ করোনার আগে পর্যন্ত বেশ জোরেসোরেই চলেছে। আমেরিকার শুল্ক আরোপের বিপরীতে চীনও পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। এতেই বোঝা যায় চীন পিছিয়ে যেতে আগ্রহী নয়। এর কারণ চীনের পৃথিবীব্যাপী পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। এখন হয়তো চীন এশিয়া বা নিজের আশেপাশে প্রভাব বিস্তারে আরো মনোযোগী হবে। ভবিষ্যতে এর বিস্তার যে আরও বৃদ্ধি পাবে তা নিশ্চিত। ফলে আমেরিকা এখন চীন, রাশিয়া উভয়কে নিয়েই মাথা ঘামাতে বাধ্য হচ্ছে।

ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি নিয়ে কৌশলী বাইডেন: আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলপত্রে পাঁচটি মূল উপাদান রয়েছে যা এ অঞ্চলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার পথনির্দেশ করবে। আমেরিকা এমন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্বপ্ন দেখে যা হবে: অবাধ ও উন্মুক্ত, আন্তঃসংযুক্ত, সমৃদ্ধশালী, নিরাপদ ও ঝুঁকি-সহিষ্ণু। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল হবে এমন একটি এলাকা যেখানে মালামাল, ধারণা ও মানুষ অবাধে স্থল, সাইবার পরিসর ও উন্মুক্ত সমুদ্রে চলাচল করবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই প্রথমবার এশিয়া সফর করলেন জো বাইডেন। এ সফরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার ও ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। দক্ষিণ কোরিয়ার সোগাং ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক জায়েচুন কিম বলেছেন, বাইডেনের এশিয়া সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের জন্য এশিয়ান প্রধান মিত্রদের সমর্থন বাড়ানো। ওয়াশিংটনের যে ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি আছে তা ইন্ডিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে আমেরিকার পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অঞ্চলে নিরাপত্তা সম্পর্কিত, অর্থনৈতিক এবং কূটনীতিক যোগাযোগকে শক্তিশালী করছে আমেরিকা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল প্রকাশ করে হোয়াইট হাউস। এতে ১০টি পয়েন্টের কথা বলা আছে, যা আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে চায় ওয়াশিংটন। এরই মধ্যে আছে জাপান-আমেরিকা-দক্ষিণ কোরিয়া সহযোগিতা বৃদ্ধি। তবে এই কৌশলের প্রধান উদ্দেশ্য যে চীনকে মোকাবিলা করা, সেখানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’র নির্বাহী প্রধান রিচার্ড ফন্টেইনের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোকে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ করে তুলবে। চীনকে চাপে ফেলতে তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিজের সঙ্গে বেঁধে ফেলতে পারবে আমেরিকা। জো বাইডেন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে আরো তৎপরতা শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সামরিক নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এশিয়া-প্যাসিফিক এলাকার নিরাপত্তা কাঠামোর বিভিন্ন উপাদানে জটিল কিছু পরিবর্তন আসবে। স্পেনের মাদ্রিদে আসন্ন ন্যাটোর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাতে যোগ দেবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও। আমেরিকা তখন এ দেশগুলোকে ন্যাটোর এশিয়া-প্যাসিফিক সংস্করণের প্রধান সদস্য হিসেবে দেখতে চাইবে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল মোটেও স্থবির হয়ে পড়েনি। নিকট ভবিষ্যতে চীনকে কূটনৈতিক অঙ্গনে আরো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

চীনের দুই চুক্তি বাড়াচ্ছে উত্তেজনা: ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সমুদ্রপথ। সাগরের পথ, বিশাল মৎসভাণ্ডার, সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় কোনো দেশই এখন সমুদ্রে অন্য দেশের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে উল্লেখিত অঞ্চলে নতুন করে প্রতিযোগিতা এবং সমীকরণ তৈরি হওয়া শুরু করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই প্রতিযোগিতায় রয়েছে চীন এবং অস্ট্রেলিয়া। এ অঞ্চলের দ্বীপগুলো এত দিন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বলয়ের মধ্যেই ছিল বলে মনে করা হতো। কিন্তু অতি সম্প্রতি চীনের সঙ্গে সলোমন দ্বীপপুঞ্চ ও সামোয়ার নিরাপত্তা চুক্তির পর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারও কূটনীতিতে এ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আমেরিকা ও এর সঙ্গে ইন্ডিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া মিলে গঠন করেছিল ‘কোয়াড’ নামে একটি জোট। এটি চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপ নামেও পরিচিত। বলা যায়, এই জোট গঠনের একটি বড় লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রম অগ্রসরমান আধিপত্য ঠেকানো। এই মুহূর্তে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো কোয়াডের দ্বিতীয় সম্মেলন। যুদ্ধের সময় এই সম্মেলন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, এবারের সম্মেলনে কোয়াড ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও এ জোটের আরো বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি ও করোনা মহামারী ইত্যাদি। এ সম্মেলনে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সমুদ্র রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে বিধ্বংসী সুনামির পর একটি অংশীদারিত্ব গ্রুপ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল কোয়াড। এরপর ২০০৭ সালে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কোয়াডকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন। প্রায় ১০ বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর ২০১৭ সালে এটি সক্রিয় হতে শুরু করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পরে জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন আমেরিকা কোয়াড শক্তিশালী করণের মাধ্যমে মূলত চীনের দৃঢ় পদক্ষেপের মোকাবিলা করতে চায়। চীনের সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং একে অপরকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যেই এ জোট গঠিত হয়েছে। যদিও কোয়াডভুক্ত দেশগুলো মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর নেই। ২০২১ সালের মার্চ মাসে দেওয়া স্পিরিট অব কোয়াড বা কেয়াডের রূপরেখা ঘোষণায় নেতারা বলেছিলেন, অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য একটি একক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ। কোয়াড সদস্যরা বলছে, ইন্দো-প্যাসিফিক পার্টনারশীপ ফর মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস (আইপিএমডিএ) প্রকল্পের মাধ্যমে প্যাসিফিক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইন্ডিয়ান সাগর সংলগ্ন দেশগুলো তাদের জলসীমায় অবৈধ মাছ ধরা এবং অন্যান্য তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে দীর্ঘদিন ধরেই ঐ অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে- চীনা জলযান তাদের জলসীমায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে।

‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল আমেরিকা-চীনের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নয়’: তবে, ঢাকায় নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গত মার্চে বলেছিলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল কোনো সামরিক জোট নয়। এর উদ্দেশ্যও সেটা নয়। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল আমেরিকাপন্থী অঞ্চল বা চীনপন্থী অঞ্চলের মধ্যেকার প্রতিযোগিতাও নয়। প্রকৃতপক্ষে, আমরা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে স্বতন্ত্র অঞ্চল হিসেবেই দেখি। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে অগ্রযাত্রা: উন্মুক্ত, সহিষ্ণু ও আন্তঃসংযুক্ত বঙ্গোপসাগর ও বহির্বিশ্বের উন্নয়নে বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক এএক সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেছিলেন। পিটার হাস বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও আমেরিকার লক্ষ্য ভিন্ন হলেও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য দু’দেশের রূপকল্প অভিন্ন। যেসব ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য অভিন্ন হয়, সেগুলো নিয়েই আমরা অগ্রসর হই, যেগুলোতে আমরা এক সঙ্গে কাজ করতে পারি এবং করি।
ইউডি/সুপ্ত

