নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পূর্বে প্রয়োজন পরিমার্জন
রাকিব উদ্দিন হাওলাদার । বৃহস্পতিবার, ০৯ জুন ২০২২ । আপডেট ১৯:১০
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে ধাপে ধাপে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নতুন কারিকুলাম ও শিক্ষা পদ্ধতি প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে। ১১৫ পৃষ্ঠার এ শিক্ষাক্রমে কিছু পরিমার্জন করা প্রয়োজন।
শিক্ষাক্রমের ২.১১ অধ্যায়ে ৩০ পৃষ্ঠায় ষষ্ঠ-দশম শ্রেণিতে ১০টি বিষয় যেমন-বাংলা, ইংরেজি, গণিত, জীবন ও জীবিকা, সামাজিকবিজ্ঞান, বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প-সংস্কৃতি উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে কৃষিশিক্ষা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ, কৃষিশিক্ষার জ্ঞান দিয়ে আত্মকর্মসংস্থান হয়, বেকারত্ব দূর হয়, দরিদ্রতা দূর হয়, জাতীয় আয় বাড়ে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়, উদ্যোক্তা তৈরি হয় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়। নবম-দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগ রাখা (বর্তমান পদ্ধতি) প্রয়োজন। অন্যথায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে এবং উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সমস্যা হবে।
শিক্ষাক্রমের ২.১৩.১ অধ্যায়ে ৮৫ পৃষ্ঠায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে নৈর্বাচনিক বিষয়ে কৃষিশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষিশিক্ষার জ্ঞান কৃষি উৎপাদনে কাজে লাগতে পারে। এতে শিক্ষার্থী ও দেশ উভয়েই উপকৃত হবে। কৃষিপ্রধান এ দেশে কৃষির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কৃষিশিক্ষা ঐচ্ছিক গ্রুপে থাকায় শিক্ষার্থীরা কৃষিশিক্ষা পড়ে না। ফলে প্রতিবছর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ১০-১২ লাখ শিক্ষার্থী কৃষির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শিক্ষাক্রমের ২.১৬ অধ্যায়ে ৯৬ পৃষ্ঠায় মূল্যায়ন ও রিপোর্টিং ব্যবস্থায় নবম-দশম শ্রেণিতে শিখনকালীন মূল্যায়ন ৫০ শতাংশ এবং সামষ্টিক মূল্যায়ন ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে শিখনকালীন মূল্যায়ন ৩০ শতাংশ এবং সামষ্টিক মূল্যায়ন ৭০ শতাংশ রাখা হয়েছে। সামষ্টিক মূল্যায়ন বা পাবলিক পরীক্ষা/প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ নম্বর রাখা প্রয়োজন। শিখনকালীন মূল্যায়ন রাখা যাবে না। কারণ এতে শিক্ষার্থীরা মোটেও লেখাপড়া করবে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। অসৎ বা দুর্নীতিবাজ শিক্ষকরা নম্বর বেশি দেওয়ার কথা বলে আর্থিক দুর্নীতি ও যৌন হয়রানি করবে। সৎ শিক্ষকরা বিভিন্ন মানুষের চাপে শিক্ষার্থীদের নম্বর দিতে বাধ্য হবে। এতে প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
শিক্ষাক্রমের ৯৭ ও ৯৮ পৃষ্ঠায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষার প্রায়োগিক বা ঐচ্ছিক একটি বিষয়ে হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে শিখনকালীন মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো পরীক্ষা হবে না। পরীক্ষা ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীই লেখাপড়া করে না। পরীক্ষা ছাড়া নম্বর দিলে শিক্ষার্থী ওই বিষয়ে কোনো জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না। প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ষষ্ঠ-দশম শ্রেণি পর্যন্ত বেশকিছু বিষয় আছে, যেগুলোর পরীক্ষা নেওয়ার নিয়ম নেই। এ বিষয়গুলোতে শিক্ষকরা স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, সুপারিশ, প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেয়। অথচ শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো ক্লাস না করে এবং না পড়ে পূর্ণ নম্বর পায়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড শিক্ষাক্রমে ক্রমেই কৃষিশিক্ষা অবহেলিত করছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষিবিজ্ঞান স্বতন্ত্র বিভাগ চালু করা হয়, যা ১৯৯২-৯৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ১৯৯৩-৯৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে কৃষিশিক্ষা আবশ্যিক/নৈর্বাচনিক বিষয় করা হয়। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঐচ্ছিক করা হয়। ব্যবহারিক নম্বর ৪০ থেকে কমিয়ে ২৫ করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা কৃষিশিক্ষা বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হচ্ছে না, কৃষির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থাৎ কৃষিশিক্ষা ঐচ্ছিক করায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা কৃষি উৎপাদনে অবদান কম রাখছে। ষষ্ঠ-দশম শ্রেণি পর্যন্ত ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে কৃষিশিক্ষা বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থী কৃষিশিক্ষার জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হবে।
কৃষিক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হওয়া সহজ ও লাভজনক। কৃষিতে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজন কৃষিশিক্ষার জ্ঞান। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি কারিগরি বা প্রায়োগিক শিক্ষার ওপর খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষিপ্রধান এদেশে কৃষিশিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম প্রায়োগিক শিক্ষা। কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষিকে বাঁচাতে হলে কৃষিশিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

