আগুন দুর্ঘটনা: বাড়াতে হবে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা
একরামুল হাসনাত । শুক্রবার, ১০ জুন ২০২২ । আপডেট ১১:৫০
আগুন দুর্ঘটনা এই মুহূর্তে আমাদের জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক বিভীষিকাময় আতঙ্কের নাম। ইদানিংকালে প্রায়ই আমরা খবর পাচ্ছি এই ভয়াবহ দানব কারো না কারো উপর জেঁকে বসেছে। এ দানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে অনেকের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে এই দানবের করাল থাবায়। আমরা হয়ত এই দানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া তাজা প্রাণগুলোকে দেখে আঁতকে উঠছি, হয়ত শোকে মুহ্যমান হচ্ছি কিন্তু এই দানবকে মোকাবেলা করতে আমাদের আসলে কতটুকু সক্ষমতা রয়েছে? কেনই বা এ দানব বার বার আমাদের আক্রমনের সুযোগ পাচ্ছে? সময় এসেছে প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে বের করার।
পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ের উপর নজর দেবার সময় এসেছে তা হচ্ছে সক্ষমতা। আগুন দুর্ঘটনা মোকাবেলা করার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আমাদের রয়েছে কিনা? তবে এই সক্ষমতা সরকারি, বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও বাড়াতে হবে। প্রত্যেককে তার নিজস্ব অবস্থান থেকে সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।মনে রাখতে হবে আগুন দুর্ঘটনার ক্ষতি ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় সকল পর্যায়কেই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সরকারকে অবশ্যই ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিকায়নে মনোযোগী হতে হবে। ফায়ার ফাইটারদের যথাযথ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।ফায়ার ফাইটারদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ না দিয়ে তাদের কাছে উচ্চাশা করা হবে অনেকটা হাত পা বেধে সাঁতার কাটতে বলার মতো। ফায়ার সার্ভিস যত বেশি আধুনিকায়ন হবে আগুন দুর্ঘটনায় ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ তত কম হবে। তাই সম্পদ রক্ষা এবং মূল্যবান প্রাণ রক্ষার স্বার্থে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন অবশ্যম্ভাবী। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সাথে সাথে সচেতনতা বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে সমভাবে জরুরী।
অগ্নিকান্ডসহ যে কোনো বিপর্যয়কর ঘটনায় ভরসা হিসেবে বিবেচিত হন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে শিল্পায়ন হয়েছে আগের ২০ বা ৩০ বছরের বেশি। একের পর এক বহুতল ভবনও তৈরি হয়েছে। বেড়েছে জাতীয় অর্থনীতির পরিসর। অথচ এ সময়ে যৌক্তিক কারণেই ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও বাড়েনি লোকবল। বাড়েনি কেমিক্যাল আগুন নেভানোর সক্ষমতা। সীতাকুন্ডের আগুনলানা গুদাম সম্পর্কে তথ্য গোপন করায় আগুনের ভয়াবহতা বেড়েছে। নয়জন ফায়ার কর্মীর প্রাণহানিও ঘটেছে একই কারণে। রাসায়নিকের আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষিত ১৫০ জন ফায়ার কর্মী রয়েছেন। তাদের কাজের জন্য রয়েছে বিশেষ সরঞ্জামাদি ও পোশাক। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে এমন প্রশিক্ষিত ১১ জন ফায়ার কর্মী থাকলেও শিল্প এলাকা সীতাকুন্ড ও পাশের কুমিরা ফায়ার স্টেশনে এ ধরনের প্রশিক্ষিত কেউ ছিলেন না। রাসায়নিকের আগুন নেভানোর জন্য বিদেশে প্রশিক্ষিত কর্মীদের নিয়ে ‘হ্যাজম্যাট’ নামের একটি ইউনিট রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের। এ ধরনের আগুনের ক্ষেত্রে ‘কেমিক্যাল প্রটেকশন স্যুট’ নামের বিশেষ পোশাক পরে কাজ করেন তারা। সদর দফতরসহ বিভাগীয় শহরে রাখা হয় এ দলের সদস্যদের। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিকটস্থ ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা সাধারণ আগুন হলে নিজে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করবেন। তবে আগুন রাসায়নিক হলে অবশ্যই প্রশিক্ষিত হ্যাজম্যাট ইউনিটকে খবর দেবেন। সীতাকুন্ডে আগুন নেভাতে যেসব ফায়ার কর্মী গিয়েছিলেন তারা মনে করেছিলেন হয়তো গার্মেন্ট পণ্যে আগুন লেগেছে। আগুন নেভাতে পানি ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। কেমিক্যালের আগুন জানলে ফায়ার কর্মীরা সে ধরনের প্রস্তুতিই নিতেন। আগুন নেভাতে আসতেন প্রশিক্ষিত কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকীকরণের প্রকল্প ১০ মাস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঝুলে থাকাও দুর্ভাগ্যজনক। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে এ প্রকল্প সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, সময় এখন অসহায়ত্ব প্রকাশের নয় বরং সময় এখন সক্ষমতা বৃদ্ধির, সময় এখন রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এবং দুর্ঘটনা মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না হলে আগুন দুর্ঘটনা নামক ফ্রাংকেনস্টাইন কেড়ে নেবে আরও তাজা প্রাণ, নিভে যাবে আরও অনেক প্রজ্বলিত আশার প্রদীপ।
লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

