যন্ত্রনির্ভরতা কমে সকলের জীবনে আসুক প্রশান্তি
হাফিজ ইসলাম । শুক্রবার, ১০ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:০৫
আমাদের দৈনন্দিন জীবন এখন বেশ সরল-সহজ রেখায় আবর্তন করে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবন থেকে নানা রকম জটিলতা দূর হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে অসহনীয় চাপ কমাতে, অস্থিরতা ডিঙিয়ে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া পেতে একসময় মানুষ প্রকৃতির দ্বারস্থ হতো। আর এখন মুশকিল আসান করতে বেশির ভাগ মানুষ প্রযুক্তির সান্নিধ্যে আসে। নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হলে প্রযুক্তির শরণাপন্ন হয়ে যান্ত্রিক সমাধান কামনা করে। জটিলতা দূর করতে প্রযুক্তিকে পাশে চায় সব সময়।
যন্ত্র আমাদের সমাধান দেয়, কিন্তু সমস্যাকে শেষ করতে পারে না। সমস্যা তৈরি হচ্ছে, হবে। দিন যত যাচ্ছে, আমাদের জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার ততই বেড়ে চলেছে। বিজ্ঞানীদের অসীম প্রচেষ্টার ফলে আমরা বিজ্ঞানের আশ্চর্যজনক আবিষ্কারগুলো পাচ্ছি। এটা বিজ্ঞানের চমকপ্রদ দিক; প্রযুক্তির আশীর্বাদ। কিন্তু বিশেষ ভাবনার হলো, দৈনন্দিন জীবনে অধিক মাত্রায় যন্ত্রপাতি আর অকল্পনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমরা যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি। আবেগ, মায়া, মমতা, মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলছি। নানান সমস্যায় নতুন নতুন রোগ-মহামারির মুখোমুখি হচ্ছি। আজকাল আমাদের মধ্যে মানুষের চেয়ে যন্ত্রকে বেশি ভালোবাসার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কেউ দুর্ঘটনার শিকার হলে আমরা তাকে রক্ষা না করে মোবাইল ফোনে তার কাতরানোর বা ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে মরিয়া হয়ে উঠি। চোখের সামনে মানুষ মরার উপক্রম হয়, অথচ কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসে না। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যন্ত্রের সাহাঘ্যেই একে-ওকে জড়ো করে হামলে পড়ি, নৃশংসতায় মত্ত হই।
যন্ত্রকে পেয়ে আমরা মায়া, মমতা, আবেগ, ভালোবাসা সবই হারিয়েছি। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই নিষ্ঠুরতম দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তথা আজ থেকে ৭৫ বছর আগে ১৯৪৭ সালের দিকে বিনয় মুখোপাধ্যায় যিনি ‘যাযাবর’ নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁর বিখ্যাত ‘দৃষ্টিপাত’ বইয়ে লিখেছিলেন, ‘আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাতে আছে গতির আনন্দ, নেই যতির আয়েস।’ সত্যিই তো; এখন আমাদের দেখা হয় কথা হয় যান্ত্রিকভাবে (ভাচুর্য়ালি); গড়ে ওঠে ‘যান্ত্রিক সম্পর্ক’। মায়া-মমতা হারিয়ে স্বার্থের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে সবাই। চলার পথে হরেক রকম যানবাহন; হাঁটার সুযোগ কই? হাতে স্মার্টওয়াচ, পকেটে মোবাইল-ট্যাব—মাথা খাটাবার সময় কই? ফেসবুকের নোটিফিকেশন, মেসেঞ্জারে টুংটুং শব্দ, হোয়াটসঅ্যাপ-ইমোতে প্রিয়জনের আহ্বান—বন্ধুকে সময় দেওয়ার ‘সময়’ কই? চোখের সামনে কম্পিউটার-ল্যাপটপের জায়ান্ট স্ক্রিনে রংবেরঙের চোখধাঁধানো আলো—প্রকৃতি দেখার সময় কই? কংক্রিট নির্মিত শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চার দেওয়ালের মাঝখানে নানান ব্যস্ততায় সবাই ব্যস্ত—মুক্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ কই?
খেলার মাঠ বিরান পড়ে আছে। প্রতিদিনের হাঁটার মেঠো পথটাতে সবুজ ঘাস, তৃণলতা জন্মেছে। সবাই যেন শুধু অনলাইনে হারিয়ে যাওয়ার তালে দিন পার করে। আর এভাবেই চেনাজানা লোকজন হয়ে উঠছে অচেনা। কাছের মানুষগুলো দূরে সরে যাচ্ছে; নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠছে কেবল মোবাইল কিংবা অন্য কোনো যন্ত্র। এখন হয়তো পাঠকমনে প্রশ্ন আসতে পারে, একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা কি একেবারে যন্ত্রবিমুখ হয়ে পড়ব? বিজ্ঞানের আবিষ্কার ত্যাগ করে প্রাচীন জীবনে ফিরে যাব? দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের মনমাতানো আবিষ্কারের রসালো স্বাদ নিচ্ছি বলেই কি আমরা যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি? গাড়িঘোড়ায় চলাফেরা বন্ধ করে দেব? উত্তরে বলব, না। আমরা বিজ্ঞানের আবিষ্কার তুচ্ছ করে আদিম যুগে ফিরে যাব না। আমরা যন্ত্র ত্যাগ করব না; কিন্তু জীবনে যতটা সম্ভব যন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে আনা যায়, সেই চেষ্টা ও সচেতনতায় থাকব। অর্থাৎ, আমাদের জীবন যেন যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে যায়। প্রযুক্তিকে আমাদের আবেগ, ভালোবাসা, মানবতাকে গ্রাস করতে দেওয়া যাবে না। যন্ত্রকে বাদ দিয়ে আমরা হয়তো চলতে পারব; তবে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের পথচলা কঠিন হয়ে পড়বে। যন্ত্রও যেমন থাকবে, যন্ত্র ছাড়া বাঁচার মন্ত্রও তেমন জানা থাকতে হবে। আমরা যেন কোনোক্রমেই একেবারে আবেগহীন যন্ত্রমানব হয়ে না পড়ি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে জীবনে আসুক প্রশান্তি লোপ পাক যন্ত্রের যন্ত্রণা।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

