ক্রিস্টোফার কলম্বাস: আমেরিকা আবিষ্কারের নেপথ্যের গল্প

ক্রিস্টোফার কলম্বাস: আমেরিকা আবিষ্কারের নেপথ্যের গল্প

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১১ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:০০

আজ থেকে ৫২৮ বছর আগে ৩রা আগস্ট ক্রিস্টোফার কলম্বাস সান্তামারিয়া, পিন্টা, নিনা নামে তিনিটি জাহাজ ও ৮৭ জন নাবিক নিয়ে অজানা সমুদ্রের পথে যাত্রা করলেন। তবে সেটা কি অজানা সমুদ্র পথে যাত্রা ছিল? কলম্বাস ইন্ডিয়ান উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন কিন্তু ভুলবশত আমেরিকার ভূখন্ড আবিষ্কার করে ফেলেন। নৌ-পথে বিভিন্ন দেশ আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।

তেরো চোদ্দ বছর বয়সে নাবিক জীবন বেছে নেন কলম্বাস। তিনি ১৪৪২ সালে ইন্ডিয়া আসার উদ্দেশ্যে জাহাজে করে স্পেন ত্যাগ করেছিলেন। এক মাসেরও বেশি সময়ে কোনো স্থলভূমির সাক্ষাৎ মিললো না। নাবিকরা ভীত হলেও হাল ছড়েন নি কলম্বাস। শেষ পর্যন্ত কলম্বাসের অকুতোভয় মানসিকতার বিজয় সূচিত হলো।

সংক্ষেপে ক্রিস্টোফার কলম্বাস
ক্রিস্টোফার কলম্বাস ছিলেন একজন ইতালীয় নাবিক ও ঔপনিবেশিক। কলম্বাসের আমেরিকা অভিযাত্রা ঐ অঞ্চলে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপনের সূচনা করেছিল।

কলম্বাসের জন্ম-শৈশবকাল
ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৫১ সালে ইতালীর জেনোয়াতে জন্মগ্রহন করেন। শৈশবকাল থেকেই কলম্বাস সমুদ্রযাত্রায় এবং নানা নতুন নতুন দেশ আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখতেন। তেরো চোদ্দ বছর বয়সে তাই নাবিক জীবন বেছে নেন। ছোটবেলায় যতটুকু লেখাপড়া শিখেছিলেন, তাতে তার ধারণা এসে গিয়েছিল যে, পৃথিবী গোলাকার। যার ফলে সমুদ্রপথে পাড়ি দিলে একদিন আবার একই জায়গায় ফিরে আসা যাবে। অবশ্য পৃথিবী যে গোলাকার তিনি জীবদ্দশায় প্রমাণ করে যেতে পারেন নি। পেরেছিলেন যোড়শ শতকের অপর একজন ইউরোপীয় নাগরিক ম্যাগেলান।

জাহাজে ইংল্যান্ডে পাড়ি
নাবিক হিসাবে জীবিকা সংগ্রহের জন্য কলম্বাস একদিন স্বদেশ ইতালীর জেনোয়া বন্দর ত্যাগ করে জাহাজে করে প্রথমে ইংল্যান্ডে; পরে শীতের দেশ আইসল্যান্ড পর্যন্ত ঘুরে এলেন পঁচিশ বছর বয়সে। তিনি ইংল্যান্ড ঘুরে গেলেন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। এখানে এসে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রীর নাম ছিল ফিলিপা মনিজ পেরেস্টেরো।

কলম্বাসের ইন্ডিয়া অভিযান
ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা তখন বিভিন্ন রত্নভান্ডারের দেশ ইন্ডিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করতে খুব উৎসাহী ছিলো। কিন্তু তখনো পর্যন্ত ইন্ডিয়াতে আসার কোনো নৌপথ আবিষ্কৃত না হওয়ায় তাদের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছিলো না। কলম্বাস ইন্ডিয়াতে আগমনের নৌপথ আবিষ্কারের জন্য অভিযানে বের হতে পর্তুগাল ও ইংল্যান্ড সরকারের কাছে সাহায্য চাইলেন। কলম্বাসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, যেহেতু পৃথিবী গোলাকার সেহেতু পশ্চিমে সোজা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিলেই তিনি পূর্বের ইন্ডিয়া মহাসাগরের এক প্রান্তে অবস্থিত স্বপ্নের দেশটিতে পৌঁছোতে পারবেন। কিন্তু দেশ দুটির শাসনকর্তারা তাকে সাহায্য করলেন না। এমন কি নিজ দেশ ইতালী থেকেও সাহায্যের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলো।

স্পেন দেশে তখন সিংহাসনে বসেছিলেন রাজা ফার্দিনান্ড এবং মহারানী ইসাবেলা। কলম্বাস তাদের কাছেও তার নৌ অভিযানের সাহায্য চাইলেন। প্রথমে রানী রাজী ছিলেন না, কিন্তু ব্যবসা–বাণিজ্য করে অনেক সম্পদশালী হতে পারবেন, এটা ভেবে শেষ পর্যন্ত কলম্বাসকে সাহায্য করতে সম্মত হলেন। রানী কলম্বাসকে নতুন কোন এলাকা স্পেনের দখলে আনতে পারলে তাকে সেই অঞ্চলের প্রধান শাসনকর্তা নিয়োগ করার আশ্বাস দিলেন। এছাড়া কলম্বাস যে ধনসম্পদ আনতে পারবেন, তার দশ ভাগের একভাগও তাকে দেওয়া হবে বলে অঙ্গীকার করলেন।

কলম্বাস একশত নাবিক এবং তিনটি জাহাজের নেতৃত্ব নিয়ে ১৪৪২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তারিখে স্পেন ত্যাগ করলেন। এক মাসেরও বেশি সময় সমুদ্র বেয়ে জাহাজ এগিয়ে চললো কিন্তু কোনো স্থলভূমির সাক্ষাৎ মিললো না। নাবিকরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অভিযান ত্যাগ করে ফিরে যাবার প্রস্তাব করলেন। কিন্তু অকুতোভয় কলম্বাস রাজী হলেন না। তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিভিন্ন দ্বীপ আবিষ্কার
শেষ পর্যন্ত কলম্বাসের অকুতোভয় মানসিকতার বিজয় সূচিত হলো। ১৪৪২ সালের ১২ই অক্টোবর আটলান্টিকের পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তের বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটা দ্বীপে পৌঁছালেন। কলম্বাসের অভিযান সফল হলো। এরপর সে যাত্রায় কলম্বাস আমেরিকার ফ্লোরিডার দক্ষিণে অবস্থিত কিউবা ও পরবর্তীকালে পশ্চিম ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপ আবিষ্কার করলেন। এই অভিযান শেষ করে স্পেনের বার্সিলোনা বন্দরে ফিরে যাবার পর রাজা রানী বীরোচিত সম্মানের সঙ্গে তাদের গ্রহণ করলেন।

কলম্বাসের জামাইকা ও মার্গারেট দ্বীপ আবিষ্কার
ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৩ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৭ টি জাহাজের একটি বিরাট নৌ বহর নিয়ে কার্ডিজ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো বেরিয়ে পড়লেন। দ্বিতীয় অভিযানে তিনি কিউবার দক্ষিণ তীরের বিভিন্ন অঞ্চল এবং জামাইকা আবিষ্কার করেন। কলম্বাস এই অভিযান শেষে ১৪৯৬ সালে স্পেনে ফিরে যান। ১৪৯৮ সালে তৃতীয়বারের অভিযানে কলম্বাস ত্রিনিদাদ আর মার্গারেট দ্বীপ আবিষ্কার করেন।

শেষ ও চতুর্থ অভিযান শেষে স্পেনে ফেরা
ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৫০২ সালের মে মাসে চারটি জাহাজ নিয়ে তার চতুর্থ ও শেষবারের মতো অভিযানে বের হলেন, যেটাকে কলম্বাস ‘বড় অভিযান’ নাম দিয়েছিলেন। তখন তার বয়স ৫১ বছর। শরীর ভেঙে পড়েছিলো, তবে মনের বল ও তেজ অটুট ছিলো। কলম্বাসের এই চতুর্থ অভিযান খুবই রোমাঞ্চকর হয়েছিলো অভিজ্ঞতার দিক থেকে। একটা যুদ্ধ হয়েছিলো ওখানকার রেড ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে এবং তাদের দুটো জাহাজও নষ্ট হয়েছিলো। এবার হন্ডুরাস নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা এইসব অঞ্চলগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিলো। ১৫০৪ সালের নভেম্বর মাসে কলম্বাস তার ছেলে, ভাই এবং বাইশজন সঙ্গী সহ স্পেনে ফেরত আসেন।

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মৃত্যু
ফিরে এসে দেখলেন রানী ইসাবেলা মৃত্যুশয্যায় রাজা নির্বিকার। তিনি একেবারে হতাশ হয়ে পড়লেন। কলম্বাস নিতান্ত অবহেলিত অবস্থার মধ্যে কিছুদিন জীবন যাপন করলেন। ১৫০৬ সালের ২০শে মে ভাল্লাডোলিও নামক স্থানে অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাস মারা যান।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading