লুই পাস্তুর: রসায়নবিদ থেকে অণুজীববিজ্ঞানী
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১০ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০
লুই পাস্তুর নিজে চিকিৎসক ছিলেন না, কিন্তু চিকিৎসা জগতে রেখে গেছেন সবচেয়ে অমূল্য অবদান। লুই পাস্তুর জলাতঙ্ক রোগের কারণ এবং তার টিকা আবিষ্কার করে অমর হয়ে আছেন। এই টিকা আবিষ্কার করে লুই পাস্তুর পৃথিবীর সর্বকালের সর্বাধিক মানুষের কল্যাণ সাধন করে গেছেন। জলাতঙ্ক রোগের টিকা আবিষ্কারক লুই পাস্তুর-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
লুই পাস্তুর এক মহান দার্শনিক বিজ্ঞানী। জীবনদর্শনে তিনি ছিলেন মানবিকতাবাদী। তিনি ছিলেন মানুষের বন্ধু। তিনি যখন মুমূর্ঘু মানুষের হাতে হাত রাখতেন, তখন তার চোখে এঁকে দিতেন মৃত্যু জয়ের স্বপ্ন! লুই পাস্তুর ১৮৫৬ সালে রামফোর্ড মেডেল পান। ১৮৭৪ সালে পান কপলি মেডেল।
লুই পাস্তুর কে ছিলেন?
লুই পাস্তুর ছিলেন একজন ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ। লুই পাস্তুর প্রথম আবিষ্কার করেন যে অণুজীব অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়ের পচনের জন্য দায়ী। জীবাণুতত্ত্ব ও বিভিন্ন রোগ নির্মূলে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন লুই পাস্তুর।
লুই পাস্তুরের প্রারম্ভিক জীবন
বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ১৮২২ খ্রীষ্টাব্দে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন ধনী চামড়ার ব্যবসায়ী। পাস্তুর পড়াশুনায় মেধাবী ছিলেন। বাবার ইচ্ছা ছিলো ছেলে বড় হয়ে অধ্যাপক হবে। পিতার ইচ্ছা পূরণ হলো লুই পাস্তুর রসায়নশাস্ত্রের উপর মৌলিক গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করলেন। পাউসেট নামক জনৈক বিজ্ঞানী পরীক্ষা করে বললেন – ‘জীব থেকেই জীবের জন্ম। জীবাণু থেকেই জীবাণুর উৎপত্তি। কিন্তু লুই পাস্তুর বললেন না জীব বা জীবাণু আপনা থেকেই জন্মাতে পারে। তিনি এটা পরীক্ষা করেও দেখালেন।
জলাতঙ্ক রোগের টিকা আবিষ্কার
সেবার স্কুল থেকে ফেরার পথে জোসেফ মিস্টার নামক এক ছেলেকে পাগলা কুকুরে কামড়ালো। ছেলের বাবা এলেন লুই পাস্তুরের কাছে। লুই পাস্তুর নিজের আবিষ্কৃত একটা ওষুধের ইনজেকশন দিলেন ছেলেটাকে। ছেলেটার আর জলাতঙ্ক রোগ হলো না। অথচ এর আগে পাগলা কুকুরে কামড়ালে মানুষের জলাতঙ্ক রোগ হতো এবং সে মারা যেতো। এভাবে লুই পাস্তুর আবিষ্কার করলেন জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক। সারা বিশ্বে লুই পাস্তুরের নাম ছড়িয়ে পড়লো। লুই পাস্তুর সবার কাছে পরিচিত হলেন জলাতঙ্ক রোগের ডাক্তার হিসাবে। অথচ লুই পাস্তুর কোনোদিনই ডাক্তারী পড়েননি। তবে রসায়নশাস্ত্রে ছিলেন পণ্ডিত।
ফ্রান্সের ব্যতিক্রমী ঘটনা
ফ্রান্সে একবার এক ঘটনা ঘটলো। ফ্রান্সের গুটিপোকার চায়ের খামারে মড়ক লাগলো। ডাকা হলো লুই পাস্তুরকে। লুই পাস্তুর দেখালেন এক ধরনের জীবাণুই হলো এই মড়কের মূল উৎস। লুই পাস্তুর জীবাণু ধ্বংসের ব্যবস্থা করলেন। মড়ক বন্ধ হলো রক্ষা পেলো কোটি টাকা মূল্যের গুটিপোকা চাষের খামার।
এ্যানথ্রাক্স রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার
আগে দেখা যেতো এ্যানথ্রাক্স নামে এক বিচিত্র রোগে প্রতি বছর হাজার হাজার জীবজন্তু মারা যেতো। লুই পাস্তুর গবেষণায় লক্ষ্য করলেন মৃত পশুর শরীরের রক্তে এক ধরনের জীবাণু রয়েছে -এর জন্যেই এই রোগ হয়। লুই পাস্তুর পরীক্ষায় লক্ষ্য করলেন যদি এই রোগের জীবাণু অল্প পরিমাণে কোনো পশুর শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই পশুটি হয়তো সেই রোগে সামান্য পরিমাণে আক্রান্ত হবে, তবে এর ফলে দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে, ফলে তার আর ঐ রোগটি হবে না। লুই পাস্তুর দেশের বহু বিজ্ঞানীকে চ্যালেঞ্জ করে তাদের সকলের সামনে এই পরীক্ষা করে তার আবিষ্কৃত তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করলেন। লুই পাস্তরের পদ্ধতি অনুসরণ করে এভাবে পরবর্তীকালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহু প্রতিষেধক ও ঔষধ ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে।
লুই পাস্তুরের জনপ্রিয়তা
দেশে লুই পাস্তুরের জনপ্রিয়তা ছিলো বিস্ময়কর। একবার ফ্রান্সে লুই পাস্তুরের জনপ্রিয়তার পরিসংখ্যান নেওয়া হয়। সেই পরিসংখানে তিনি পেয়েছিলেন সর্বাধিক সংখ্যক ভোট। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছিলেন যথাক্রমে সম্রাট নেপোলিয়ান ও ভিক্টর হুগো। বিদেশেও লুই পাস্তুর অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দে পাস্তুর জাতীয় কংগ্রেসের এক অধিবেশনে ফ্রান্সের প্রতিনিধি হয়ে লন্ডনে যান। লুই পাস্তুর যখন অধিবেশন হলে গিয়ে পৌঁছলেন তখন লোকে একেবারে ভেঙে পড়েছে। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য লুই পাস্তুর ভাবছিলেন, রাজা বোধ হয় আসছেন সম্মেলন কক্ষে অধিবেশন উদ্বোধন করতে।
লুই পাস্তুর পাশে বসা সভাপতিকে বললেন, নিশ্চয় এখন রাজা আসছেন, তাই সবাই এমন জয়ধ্বনি করছে। সভাপতি জানালেন, না রাজা আসছেন না। ওরা আপনাকেই অভিনন্দন জানাচ্ছেন। ওরা আপনাকেই এক নজর দেখার জন্য এতো ভিড় করেছে। আপনি এ অধিবেশনে আসছেন, এ সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীতে সর্বকালে সর্বযুগে যে মানুষটি মানবসমাজের সর্বাধিক কল্যাণ সাধন করে গেছেন, তিনি হলেন বিজ্ঞানী লুই পাস্তর।
লুই পাস্তরের উল্লেখযোগ্য অবদান ও আবিষ্কার
লুই পাস্তুর বায়োজেনেসিস তত্ত্বের প্রবক্তা। এই তত্ত্বানুসারে ‘জীব থেকেই জীব সৃষ্টি হয়’ লুই পাস্তুর তা বিশ্লেষণ করেন। তিনি পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতির উদ্ভাবক। এই পদ্ধতিতে দুধকে নির্দিষ্ট উষ্ণতায় গরম করে দুধকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা হয়। তার আবিষ্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুটিপোকার মড়ক রোধ, অ্যানথ্রাক্স রোগের প্রতিষেধক, চিকেন কলেরার টীকা আবিষ্কার এবং সর্বোপরি জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার।
মহান বিজ্জানীর মৃত্যু
১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৮ শে সেপ্টেম্বর ৭৩ বছর বয়সে এই মনীষীর মৃত্যু হয়। ফ্রান্সে তার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি গবেষণা কেন্দ্রের চত্বরেই লুই পাস্তরকে সমাহিত করা হয়। আজো লাখো ভক্ত লুই পাস্তুরকে প্রতিদিন শ্রদ্ধা জানায়।
ইউডি/অনিক

