অর্থমন্ত্রীর যুগান্তকারী প্রস্তাবনা: দেশে ডিজিটাল মুদ্রার সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১১ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:৫৫
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়টি পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ফলে বাজেটের পাশাপাশি ডিজিটাল মুদ্রা প্রসঙ্গটিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। কিছুটা বিতর্ক থাকলেও বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয় এই মুদ্রা। অর্থমন্ত্রীর যুগান্তকারী প্রস্তাবনা ডিজিটাল মুদ্রা ও এর সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক।
ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার ব্যবহার বিশ্বব্যাপী ব্যাপক হারে বাড়ছে। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার বাড়তে থাকায় এখন অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিজস্ব মুদ্রার ডিজিটাল সংস্করণ চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো ভার্চুয়াল লেনদেনের অর্থ আদান প্রদান সহজ করা এ কারণে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও দেশে ডিজিটাল মুদ্রা চালু করা যায় কিনা সে ব্যাপারে সমীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। বাজেটে বলা হয়, ভার্চুয়াল মুদ্রা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বিশ্বব্যাপী ব্যবহার বাড়তে থাকায় এর বিকল্প হিসাবে বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিজস্ব মুদ্রার ডিজিটাল সংস্করণ চালু করার লক্ষ্যে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি) বা সিবিডিসি চালু করার মূল উদ্দেশ্য হলো ভার্চুয়াল লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ আদান-প্রদান সহজতর করা এবং স্টার্টআপ ও ই-কমার্স ব্যবসায়কে উৎসাহ প্রদান। সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপের কারণে দেশে ইন্টারনেট ও ই-কমার্সের প্রসার ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে সিবিডিসি চালু করার লক্ষ্যে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনা করা হবে।
ডিজিটাল মুদ্রা ও এর লেনদেন
বিশ্বে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রা। ২০০৯ সালে প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে এসেছিলো বিটকয়েন। এখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিটকয়েন, লাইটকয়েন, এথেরিয়াম, রিপলের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেন হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশে এগুলো বৈধ নয়। ডিজিটাল এসব মুদ্রা লেনদেন হয় ভার্চুয়ালি অর্থাৎ টাকা বা কাগজের নোটের মতো এগুলো দৃশ্যমান নয়। তবে এখন যেসব ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে সেগুলোর কার্যত কোন কর্তৃপক্ষ নেই এবং যে কান জায়গা থেকে যে কোন ব্যক্তি যে কোন সময় এর লেনদেন করতে পারেন। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি হয় যে কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যদিও কোন কোন দেশ এখন খতিয়ে দেখছে যে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে কীভাবে একটি মনিটরিংয়ের আওতায় আনা যায়। কিন্তু এর লেনদেন, বিনিময় হার এবং আইনগত ভিত্তি না থাকায় বড় বড় প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে এসব মুদ্রা নিয়ে। এ কারণেই এখন আলোচনায় এসেছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজিটাল মুদ্রা ইস্যু করা যায় কি-না।
বর্তমান প্রচলিত মুদ্রার যে অনলাইন লেনদেন হয় তার সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রার একটি পার্থক্য রয়েছে। যেমন বর্তমানে আমেরিকায় অনলাইনে কেনাকাটা হলেও বিল করা হয় ডলারে, কিন্তু ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রে ডলার নয় বরং মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে বিক্রেতার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ডিজিটাল মুদ্রা। বর্তমানে ভেনমো, পেপল বা অ্যাপল পের মতো যেসব পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করে মানুষ অর্থ পরিশোধ করে তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। মুদ্রার ইলেকট্রনিক রূপ এরই মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। যেমন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দেশ আমেরিকায় ডলারের বাহ্যিক ব্যবহার মোট অর্থ সরবরাহের মাত্র এক-দশমাংশ। বাকি লেনদেন অনলাইনে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন নিজেদের মুদ্রা তৈরি ও তার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে। যে ডিজিটাল মুদ্রাকে বলা হচ্ছে সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি বা সিবিডিসি।

ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবনা
সরকার দেশে ডিজিটাল মুদ্রা চালু করতে চায়, যার মাধ্যমে অনলাইনে আর্থিক লেনদেন করা যাবে। যদিও এখনও আমাদের দেশে এই আধুনিক প্রক্রিয়া এখনও জনসাধারণের বোধগম্য নয়; তবুও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের এ ব্যাপারে এখনই ভাবতে হবে। ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবনা একটি যুগান্তকারী প্রস্তাবনা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী এ সম্পর্কে বলেন, বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার বাড়তে থাকায় এর বিকল্প হিসেবে বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিজস্ব মুদ্রার ডিজিটাল সংস্করণ চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা চালু করার মূল উদ্দেশ্য হলো, ভার্চুয়াল লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ আদান-প্রদান সহজতর করা এবং স্টার্টআপ ও ই-কমার্স ব্যবসাকে উৎসাহ প্রদান। সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপের কারণে দেশে ইন্টারনেট ও ই-কমার্সের প্রসার ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা দেশে চালু করার লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ইতিবাচক মত পাওয়া গেলে দেশে চালু করা হবে ডিজিটাল মুদ্রা।
প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ব্যাপক ও দ্রুততর করার লক্ষ্যে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের বিষয়টি পরীক্ষা করা হবে। বিভিন্ন উন্নত দেশের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারতসহ এশিয়ার কিছু দেশে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রাথমিক বাস্তবায়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। এ ধরনের ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হলে তরুণ আইটি কর্মীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
ডিজিটাল মুদ্রার সম্ভাবনা
আমাদের দেশে উন্নত বিশ্বে ক্রিপ্টোকারেন্সির জনপ্রিয়তা দ্রুতই বাড়ছে। আর্থিক লেনদেনে মানুষের চিন্তাধারাকে আমূল বদলে দিচ্ছে সময়োপযোগী এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে বর্তমানে বিশ্বে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজার দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিখ্যাত মার্কিন বৈদুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান-টেসলার প্রধান নির্বাহী এলন মাস্ক বিটকয়েনে বিপুল বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। জাপান, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক-মুদ্রা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ডিজিটাল ইউয়ান চালু করেছে চীন। বোঝাই যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে ডিজিটাল মুদ্রাই ব্যাংকিং জগতের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে।
এছাড়াও ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রভাব পড়েছে দেশের তথ্যপ্রযুক্তিখাতে। বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের বিনিময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেনের অফার দিচ্ছে দেশীয় ফ্রিল্যান্সারদের। এখাতে বাংলাদেশি সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিগুলোর জন্য ভালো সুযোগ থাকলেও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা চালু করলে বাংলাদেশি সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিগুলোর জন্য একটি সম্ভাবনাময় দ্বার উন্মোচিত হবে। বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল মুদ্রার জনপ্রিয়তা যেভাবে বাড়ছে তাতে ভার্চুয়াল মুদ্রাকে এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
ডিজিটাল মুদ্রায় লাভ কী
ডিজিটাল মুদ্রায় সব ধরনের পেমেন্ট এবং যে কোন লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা যাবে বলে সাধারণ মানুষেরও লেনদেনজনিত ব্যয় কমবে। এছাড়া বাংলাদেশে টাকা ছাপানো ও নিয়মানুযায়ী নষ্ট বা ব্যবহার অযোগ্য টাকা ধ্বংস করতে গত বছরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। টাকা ছাপানোর পর বিতরণেও হয়ে থাকে বিপুল খরচ। ডিজিটাল মুদ্রা চালু হলে এসব খরচ বেঁচে যাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। বৈধ ডিজিটাল মুদ্রায় কেনাকাটা, লেনদেন বা অর্থ পরিশোধ সবই হবে দ্রুত। আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর বা রেমিট্যান্স প্রেরণে ব্যয় কমবে, নগদ অর্থ বহন করতে হবে না, অ্যাকাউন্টের বাইরে বা ব্যাংক সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সুবিধা পাবে। সরকারি কর বা ভ্যাট সংগ্রহ সহজ হবে আবার দরিদ্রদের ভাতা বা বৃত্তি পাওয়া সহজ হবে। অর্থ প্রেরণের সহজ সুবিধা পেয়ে মানুষ অবৈধ মুদ্রায় লেনদেন করবে না। এসব সুবিধার কারণেই স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মুদ্রার বিষয়ে চিন্তা শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

সুবিধাবহুল ডিজিটাল মুদ্রার ঝুঁকি
ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি। যথাযথ সাইবার নিরাপত্তা না দিতে পারলে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে এই সেবা। হ্যাকিং এর শিকার হলে জনগণ কি সেই মুদ্রা ফেরত পাবে কিনা সেটা এখনো সন্দিহান। ডিজিটাল ওয়ালেট বা লেনদেনের বিষয়টি প্রযুক্তিগতভাবে দেখভাল করাটাও চ্যালেঞ্জের বিষয় হবে এবং সবাইকে নিজের ওয়ালেট ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে। এগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকতে হবে। সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তানভীর হাসান জোহা বলছেন, “ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহারের জন্য মানুষ ইন্টারনেটে যুক্ত হবে ও পাবলিক নেটওয়ার্কে থাকবে। কিন্তু সেখানে সাইবার নিরাপত্তা কতভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে সেটি আগে যাচাই করে দেখতে হবে। ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে।”
নতুন প্রজন্মের আর্থিক চাহিদা পূরণে ‘ডিজিটাল ব্যাংক’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংক ‘ব্যাংক এশিয়া’। এটি হবে ব্যাংক এশিয়ার একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান, যার ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকবে নিজেদের হাতে। বাকি শেয়ারের অংশীদার হবে বিদেশি প্রাযুক্তিক ও লেনদেন প্রতিষ্ঠান। এ ব্যাপারে অনুমতি চেয়ে তারা ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করেছে। ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের নীতিমালা প্রণয়নের জন্য গত বছর কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের ব্যাংকের মাধ্যমে যে কেউ ঘরে বসে বিভিন্ন সেবা নিতে পারবেন। ডিজিটাল ব্যাংক যুক্ত থাকবে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ অব বাংলাদেশের (এনপিএসবি) সঙ্গে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকের গ্রাহকেরা অন্য ব্যাংকের সেবাও নিতে পারবেন।
ইউডি/অনিক

