গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে বাড়তি চাপে পড়বেন গ্রাহকরা
নাদিরা পারভিন । শনিবার, ১১ জুন ২০২২ । আপডেট ১৪:১৫
শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দাম বাড়ানোই হলো। প্রতি ঘনমিটারে ৯ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১ টাকা ৯১ পয়সা। ভোক্তা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির হার ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আবাসিকে এক চুলার গ্যাসের দাম ৯৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৯০ টাকা এবং দুই চুলার গ্যাসের দাম ১ হাজার ৮০ টাকা করা হয়েছে। আর প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ১২ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৮ টাকা। এতে এই শ্রেণির গ্রাহকদের মাসে খরচ বাড়বে প্রায় ৪৩ শতাংশ। গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে শুধু বাসাবাড়ির রান্নার খরচ বাড়বে না, বাড়বে সার কারখানা ও শিল্পের উৎপাদন খরচও। গ্যাসের এই নতুন দাম ১ জুন থেকেই কার্যকর করা হয়েছে।
গাসের দাম বৃদ্ধির কারণে সব শ্রেণির গ্রাহকই চাপে পড়বেন। বস্তুত এ সময় গ্যাসের দাম বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে মনে করি আমরা। দেশে বেশকিছু দিন ধরে দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। এরই মধ্যে কিছুদিন আগে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাড়ছে খাদ্যশস্যের দাম। নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি আরও প্রকট হবে। কারণ গ্যাসের দাম বাড়লে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর ব্যয় বেড়ে যাবে।
অন্যদিকে উৎপাদন পর্যায়ে জ্বালানির (গ্যাস) দাম বাড়ায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে অনিবার্যভাবেই বাড়বে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়। সবকিছু মিলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে। এতে একদিকে বাড়বে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো হারাবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এর ফলে করোনা মহামারির অভিঘাত থেকে দেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ব্যাহত হবে। আমরা জানি, করোনা পরিস্থিতিতে অনেক মানুষ কাজ বা চাকরি হারিয়েছে। ছোট ও মাঝারি অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই এ সময় গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি বলে মনে করি আমরা।
গ্যাসের নতুন মূল্যহারকে যৌক্তিক বলে মনে করছে এফবিসিসিআই। এফবিসিসিআই মনে করে, গ্যাসের নতুন দর বৃদ্ধি যৌক্তিক। দেশের সব ধরনের শিল্প খাতের সক্ষমতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্পের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
তবে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম মান্নান কচি সমকালকে বলেন, অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চলছে এখন। রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা-উদ্বেগ আছে। বাস্তবতা বিবেচনায় গ্যাসের দর বৃদ্ধির এটা উপযুক্ত সময় নয়। এমনিতেই কাঁচামালের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির কারণে নিট মুনাফা কমছে পোশাকশিল্পের। এর মধ্যে গ্যাসের দর বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। গ্যাসের বর্ধিত দরকে স্বাগত জানিয়েছেন বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা। তারা বলেছেন, এ মুহূর্তে সহনীয় হারে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি একটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দ্রব্যমূল্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ সময়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পণ্যমূল্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিল্প উদ্যোক্তারা কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে আরও চাপে পড়বে শিল্প খাত। কারও মতে, বড় বাজেটে ভর্তুকির বোঝা কমাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। মূল্যবৃদ্ধিকে সহনীয় উল্লেখ করে
সরকারকে এ জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। তবে পাইকারি পর্যায়ে যেহেতু গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা এখনো আসেনি, সেহেতু আমরা আশা করব এক্ষেত্রে সরকার শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবে। কারণ পাইকারি গ্যাস সব ধরনের শিল্পকারখানা ব্যবহার করে। অন্যদিকে ঘন ঘন গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে এ ব্যাপারে সরকারের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেওয়া উচিত। গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে এ খাতের সিস্টেম লস দূর করার বিষয়ে মনোনিবেশ করা উচিত। তাহলে এ খাতের অপচয় দূর হবে।
লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

