কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন আজ : ইসির প্রথম পরীক্ষা কেমন হবে ?

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন আজ : ইসির প্রথম পরীক্ষা কেমন হবে ?
উত্তরদক্ষিণ । ১৫ জুন ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:১০

আজ বহুল প্রতিক্ষীত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নিজেদের ইনিংস শুরু করতে যাচ্ছেন নতুন নির্বাচন কমিশন। আর তাই তাদের জন্য সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন সম্পন্ন করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। গোটা বাংলাদেশ আজ কুমিল্লার দিকে তাকিয়ে থাকবে, এই নির্বাচনের ওপর ভর করেই নতুন ইসির সক্ষমতা যাচাই করবে মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোও ইসির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে সূক্ষভাবে। নিজেদের সূচনা নতুন ইসি কেমন করে সেটাই দেখার বিষয়। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন উপলক্ষে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। মঙ্গলবার (১৪ জুন) কেন্দ্রে-কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। গত ১৮ দিন ধরে প্রার্থীরা নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করেছে। এখন পালা ভোটারদের নগর পিতা নির্বাচনের। এ নির্বাচনে মেয়র পদে মেয়র পদে ছয় জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। এরা হলেন- আওয়ামী লীগ মনোনীত আরফানুল হক রিফাত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. রাশেদুল ইসলাম, স্বতন্ত্র হিসেবে কামরুল আহসান বাবুল, মো. মনিরুল হক সাক্কু (সাবেক বিএনপি নেতা ও দুই বারের মেয়র), মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন ও মাসুদ পারভেজ খান। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাসুদ পারভেজ খান প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। অর্থাৎ মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচ প্রার্থী। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মনিরুল হক সাক্কুর চেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করছেন অনেক ভোটার। কেননা, সাক্কু দলীয় সমর্থন ছাড়াই নির্বাচন করছেন। সাবেক বিএনপি নেতা সাক্কু কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) সদ্য সাবেক মেয়র। দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ভোটাররা আরও বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাক্কু নির্বাচনে জেতার জন্য জনগণের সরকারবিরোধী মনোভাবকে পুঁজি করতে পারেন। ফলে, একটি বড় অংশের ভোট সাক্কুর পক্ষে পরতে পারে।

কাজী হাবিবুল আউয়াল

সাক্কু বলছেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই: নির্বাচনে কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী নির্বাচনের দিন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। কুসিকের সদ্যসাবেক এই মেয়র বলেন, ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য (এমপি) এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহার ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন। এমনকি নির্বাচন কমিশন চিঠি দিয়ে তাকে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিলেও তিনি তা মানছেন না। এমপি যখন ভোটারদের প্রভাবিত করছেন, তখন প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশন কেন এই নোটিশ দিলো?’, যোগ করেন তিনি।

মনিরুল হক সাক্কু

রিফাতের দাবি মানুষ পরিবর্তন চায়: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত বলেছেন, কুমিল্লা শহরের মানুষ পরিবর্তন চায়। তিনি জানান, কুমিল্লা শহরের মানুষ তাকে ভোট দেবে। কারণ তারা দুর্নীতিমুক্ত একটি নতুন মুখ দেখতে চান।
তিনি বলেন, গত ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছি। তৃণমূল থেকে আমি উঠে এসেছি। এই শহরের মানুষ এটা খুব ভালো করেই জানেন। কাজেই, তারা আমার সঙ্গে থাকবেন। আমি আওয়ামী লীগের একজন সৎ ও পরীক্ষিত কর্মী।

আরফানুল হক রিফাত

কারচুপির আশঙ্কা কায়সারের: নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার ভোটের দিন কুমিল্লার সব সরকারি, আধা সরকারি অফিস-আদালত বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (১৪ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় নগরীর বাদুরতলাস্থ শিশুমঙ্গল রোডে প্রধান নির্বাচনী ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবি জানান তিনি। নির্বাচন কমিশন কথা রাখছে না উল্লেখ করে কায়সার বলেন, এ পর্যন্ত একজন এমপিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি কমিশন। ইভিএম প্রসঙ্গে কায়সার বলেন, আমি গতকাল রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছিলাম যেন ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল প্রিন্ট আকারে প্রদান করা হয়। কিন্তু ইতিবাচক সাড়া এখন অবধি পাইনি। এটা কমিশনের পাঁয়তারা করে ভোট চুরির একটা চক্রান্ত বলে জানান কায়সার। হাতে লিখে ফলাফল বিবরণী দিলে তাতে কারচুপির সুযোগ থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে, প্রিন্ট আকারে ফলাফল ঘোষণার দাবি তোলেন কায়সার।

নিজাম উদ্দিন কায়সার

১০৫ কেন্দ্রে ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ৯২০ জন: মঙ্গলবার কুমিল্লা জিলা স্কুলের শহীদ আবু জাহিদ মিলনায়তন থেকে কেন্দ্রে-কেন্দ্রে ইভিএম বিতরণ করা হয়েছে। ট্রাকে করে সকাল থেকে এই বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ১০৫টি ভোট কেন্দ্রে নিয়োগকৃত ১০৫ জন প্রিজাইডিং অফিসারের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের সরঞ্জামাদি বিতরণ করা হয়। রিটার্নিং অফিসার মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে কেন্দ্র্রের ভোটগ্রহণ সরঞ্জামাদি সুষ্ঠুভাবে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাগণ বিতরণ করছেন। প্রিজাইডিং অফিসারগণ কেন্দ্রে নিয়োগকৃত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের নিয়ে ভোট গ্রহনের কেন্দ্রগুলোতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২ জন মহিলা ভোটারসহ ২ লাখ ২৯ হাজার ৯২০ জন ভোটার তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনে হিসাব নিকাশ করছেন। এবার কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ৫ জন মেয়র প্রার্থী, ৯টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৩৬ জন মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী এবং ২৫টি ওয়ার্ডে ১০৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২টি ওয়ার্ড ৫ ও ১০ নং ওয়ার্ডে একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ২ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

নিরাপত্তায় ২ হাজার পুলিশ: এদিকে, নির্বাচনে নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ। তিনি বলেছেন, ভোটারদের নিরাপত্তায় এবং কেন্দ্রে যেন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে কারণে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নির্বাচনে নিরাপত্তায় দুই হাজার ১০০ পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। সিটি নির্বাচন উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৪ জুন) সকালে কুমিল্লা স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার এ কথা বলেন।
ফারুক আহমেদ বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনের (সিইসি) বক্তব্য অনুযায়ী এই নির্বাচন সারাদেশের মডেল নির্বাচন হিসেবে উপহার দিতে চাই। এ জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমরা দৃঢ় বিশ্বাসী, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পারবো। তিনি আরও বলেন, ভোটের দিন ২৭ ওয়ার্ডের সব কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তিন হাজার ৬০৮ জন সদস্য থাকবে। ৭৫টি চেকপোস্ট, ১০৫টি মোবাইল টিম, ১২ প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাবের ৩০টি টিম, ১০৫ কেন্দ্রে এক হাজার ২৬০ আনসার সদস্য ও এপিবিএনের ৫০ জন সদস্য নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়জিত থাকবেন।

৯২ পর্যবেক্ষকের নজরদারিতে থাকবে ভোট: ভোট পর্যবেক্ষকের নজরদারিতে থাকবেন ৯২ জন। সাতটি সংস্থার আওতায় ৯২ পর্যবেক্ষক কুসিক ভোট পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবেন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ শাখা থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানান, এই সিটি ভোট পর্যবেক্ষণে কোনো বিদেশি পর্যবেক্ষক আবেদন করেননি। দেশি সাতটি সংগঠনের মোট ৯২ পর্যবেক্ষককে ভোট পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ইসি জানায়, জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) ৬, সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের ১৩, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার ৬, রিহাফ ফাউন্ডেশনের ২৭, বিবি আছিয়া ফাউন্ডেশনের ২৭, মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার (মওসুস) ৫ ও সমাজ উন্নয়ন প্রয়াসের ৫ পর্যবেক্ষকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সংসদ সদস্যকে নিজ এলাকা ছাড়তে বলা মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ’: এদিকে, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, কোনো সংসদ সদস্যকে তার নিজ নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা তার মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপের সামিল । তিনি মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন।মন্ত্রী বলেন, প্রথমত আমার প্রশ্ন হচ্ছে যিনি ঐ এলাকার সংসদ সদস্য, ঐ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা যিনি ঐ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ভোটার, তাকে নির্বাচন কমিশন এলাকা ছাড়ার কথা বলতে পারে কি না। এটি কি তার মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ নয় ? তাহলে তো ঢাকা শহরে যখন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হবে, তখন ঢাকা থেকে নির্বাচিত সব সংসদ সদস্য, মন্ত্রীদেরকেও ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এভাবে তাকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে তার মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়েছে বলে আমি মনে করি’ উল্লেখ করে ড. হাছান বলেন, ‘তিনি যাতে কোনো নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা বা নির্বাচনী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ না করেন, সেটির নির্দেশনা অবশ্যই থাকবে, থাকা বাঞ্ছনীয় এবং সেটি করলে, অন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু যিনি ওখানে ভোটার ঐ এলাকার সংসদ সদস্য, তাকে নিজের ভিটে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা কি সমীচীন হয়েছে, সেটিই হচ্ছে প্রশ্ন ?’

উত্তরদক্ষিণ । ১৫ জুন ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ সর্বশেষ কুসিক নির্বাচন হয়েছিল। নির্বাচিত করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই বছর ১৭ মে। ভোটগ্রহণ করার শেষ সময় ছিল চলতি বছরের ১৬ মে। কিন্তু বিগত কমিশন বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসায় আর তফসিল দেয়নি। ফলে অতি অল্প সময়ের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে এই সিটি পরিচালনায় দায়িত্ব দিতে হয়েছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে। নির্বাচনের পর নতুন মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনি করপোরেশন পরিচালনা করবেন।
২০১৭ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কু দ্বিতীয়বারের মতো এ সিটিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কুসিকের প্রথম নির্বাচনেও ২০১২ সালে তিনি জয়লাভ করেছিলেন। প্রথমবার বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় সাক্কু স্বতন্ত্র থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। পরের বার বিএনপির টিকিটে ধানের শীষ প্রতীক নিয়েও জয়লাভ করেন। এবারও বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে ও আজীবন দল থেকে বহিষ্কার করায় সাক্কু হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। দুটি পৌরসভাকে একীভূত করে ২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন গঠন করে সরকার।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading