বৈষম্য দূর করতে পারলে কমবে সমাজে অস্থিরতা
ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী । বুধবার, ১৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১৬:৩৫
সমাজ মানেই কিছু মানুষ একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বসবাস করে। নির্দিষ্ট গণ্ডিগুলো ছোট ছোট। কিন্তু তার থেকে বড় গণ্ডি মানুষই তৈরি করে। সমাজের প্রয়োজনেই এগুলো তৈরি হয়। সমাজে মানুষের মধ্যে যে অস্থিরতা আছে সেটি স্বভাবগত। এ অস্থিরতা মোটামুটি চাপা দিয়ে মানুষের যে সমাজটা তৈরি করা হয়েছে, সেটা যাতে স্থির থাকে সে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমরা এক অর্থে বলতে পারি, পৃথিবীটাই তো অস্থির, সংস্কৃতি তো অস্থির হবেই। সমাজের সংগঠন যেমন হবে, এর সঙ্গে সঙ্গে তার মূল্যবোধগুলো তৈরি হবে। আধুনিক যন্ত্রকৌশল-তথ্যপ্রযুক্তি-সমৃদ্ধবিজ্ঞান শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। অদম্য অগ্রগতিতে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মহাসড়কে পদার্পণ বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সরকার ও দেশবাসীকে করেছে অধিক মাত্রায় সমাদৃত। প্রাকৃতিক-মানবসৃষ্ট দুর্যোগের বিপর্যস্ততা পরিহারে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বড় অসহায়। আয় বৈষম্যে বিশাল ব্যবধান ও ভারসাম্যহীন অসম প্রতিযোগিতা সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তির স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থ-সম্পদের আকাশচুম্বী ঊর্ধ্বগতি অবাক করার বিষয়।
দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, তা সবাই সম্যক অবগত আছেন। প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কষ্টার্জিত অর্থ ও দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে সবল রাখতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও চিহ্নিত দুর্বৃত্তদের অসহনীয় অভিপ্রায় দমনে রাষ্ট্র পরিপূর্ণ সার্থক হতে পেরেছে; জোর গলায় তা দাবি করা সমীচীন হবে না। বিস্ময়ের বোবা চোখে-অন্তরে শুধু সচেতন মহল নয়; আপামর জনসাধারণের ক্ষোভিত-বিক্ষুব্ধ সমালোচনা-আচরণে ক্ষেত্রবিশেষে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা কয়েকশগুণ বৃদ্ধি পেলেও দারিদ্র্যের হার কিভাবে অধোক্রমে তাড়িত হচ্ছে, তারও সঠিক পরিসংখ্যান নির্ধারিত হওয়া অতি জরুরি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিসংখ্যান কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করে না। বাস্তবে কোটিপতি বেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। তারা এই বৃদ্ধিকে সমাজে আয় বৈষম্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বলেও মনে করেন। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে কোটি টাকার হিসাব বাড়ছে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় দেশে কোটি টাকার আমানতকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কোটি টাকার হিসাব বাড়ার অন্যান্য কারণ হিসাবে তারা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হওয়া, পুঁজিবাজারের অস্থিরতা ও সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন শর্তের ব্যাপারও উল্লেখ করেছেন। সচেতন মহলের অনেকের মতে, দেশের একটা শ্রেণির আয় বেড়েছে, যাদের সংখ্যা খুবই সামান্য। সমাজের অনেক মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নমধ্যবিত্তে ও নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন আয়ে নেমে গেছে। একদিকে কিছু লোক অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে, অন্যদিকে সিংহভাগ লোকের আয় কমে যাচ্ছে। এ কারণে সমাজে বৈষম্য বেড়ে এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অতি ধনী ও ধনী বৃদ্ধির এ তথ্য ভবিষ্যতে আয় বৈষম্য আরও বাড়ার লক্ষণ। দেশে উচ্চবিত্ত বাড়ার হার বেশি হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষদের চাপে পড়ার শঙ্কা থাকে। তারা আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ-মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি-আয় বৈষম্য-ঋণখেলাপি-দুর্নীতি ও অনিয়মের সামগ্রিক প্রভাবেই দেশে ধনীর সংখ্যা বেড়েছে। দেশে ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি হঠাৎ কোনো বিষয় নয়। তবে প্রবৃদ্ধির হারে বিশ্বের শীর্ষে থাকা ধনীর তালিকা বাংলাদেশের জন্য বেদনাদায়ক।
সমাজে মানুষে মানুষে ধনসম্পদের যে বৈষম্য, তা যদি মোটামুটি একটা সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারা যায়, তাহলে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ অনেকটা কমে আসবে। অস্থিরতা কমে আসবে। অস্থিরতা দেখা দিলে সাধারণ মানুষ এগুলো রুখে দাঁড়াবে। তবে মানুষের যে প্রতিরোধ স্পৃহা, সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে। তার মানে সমাজটাই একটা জীর্ণ দশার মধ্যে চলে গেছে। মানুষ কিছুতেই মানুষকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। দয়া, মায়া এসব ভালো প্রবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে লোভ, ঈর্ষা, হিংসা ইত্যাদি ইতর প্রবৃত্তি আছে। এগুলোর বৃদ্ধি ঘটে কখন? যখন বৈষম্য দেখা যায়। তখন সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ে। এটাকেই আমরা বলছি সিম্বলিক অস্থিরতা। এটাকেই আমরা বলছি সামাজিক অস্থিরতা। কাজেই সমাজের বৈষম্যগুলো যদি দূর করতে পারা যায়- শিক্ষার বৈষম্য, প্রতিভার বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য যদি অন্তত কমিয়ে আনা যায়, তাহলে অস্থিরতা কমে আসবে। তবে অবাস্তব কল্পনার দিকে গেলে চলবে না। যেমন, একদম সমান করে দাও। এটা সম্ভব হবে না। না হোক, তবু বৈষম্যগুলো কমিয়ে আনতে হবে।
ইউডি/সুস্মিত

