বেড়েই চলেছে ফেসবুকে প্রতারণার নানা ফাঁদ
জুবায়ের আহমেদ । বুধবার, ১৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১৬:৫৫
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেসবুক। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মার্ক জুকারবার্গের নেতৃত্বাধীন মার্ক এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন, এন্ড্রু ম্যাককলাম, ডাস্টিন মস্কোভিটজ ও ক্রিস জিউজেসের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে ফেসবুকের। প্রথমে এটির নাম দি ফেসবুক ডট কম থাকলেও পরবর্তী সময়ে শুধু ফেসবুক ডট কম করা হয়, এ নামেই এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ফেসবুক। ফেসবুকের উন্মাদনা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। বাংলাদেশে স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ার পর থেকেই ফেসবুক পৌঁছে গেছে দেশব্যাপী ঘরে ঘরে। ফেসবুক আইডি খোলার জন্য বয়সের কোনো বিধি নিষেধ না থাকায় কিশোর বয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত ব্যবহার করছে ফেসবুক।
দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মের পাশাপাশি ফেসবুক ব্যবহার এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মানুষ সময় পেলেই ফেসবুক ব্যবহার করলেও শুধু ফেসবুকভিত্তিক বহু কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে বহু তরুণ-তরুণী কাজ করছেন, পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিজেদের পণ্যের মার্কেটিং করছে, ক্রেতা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে এখন বহু ব্যবসা বিদ্যমান, যাদের ব্যবসা পুরোপুরিই ফেসবুকভিত্তিক।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের জুড়ি নেই। এটির উদ্দেশ্য মূলত পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা, নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, সর্বোপরি নিজ নিজ কাজের বাইরে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটানো হলেও বাংলাদেশে ফেসবুক এখন মৌলিক অধিকারগুলোর মতো হয়ে গেছে। ফেসবুকভিত্তিক কাজকর্ম ছাড়াও, খেলাধুলা, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মনীতিসহ এমন কোনো বিষয় নেই যার চর্চা হয় না ফেসবুকে। ফেসবুক দিয়ে বহু ইতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা গেলেও অসাধু ব্যক্তিরা ফেসবুককেও নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের মাধ্যম হিসেবে পরিণত করেছে। এর মাধ্যমে বহু ভালো কাজ হলেও প্রতারিত হওয়ার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।
ফেক আইডি খোলার মাধ্যমে নানা রকম ফাঁদ পাতছে প্রতারকরা। যাদের মিথ্যা ও প্রতারণামূলক কথাবার্তায় আকৃষ্ট হয়ে প্রতারিত হচ্ছে বহু সহজ সরল মানুষ। এদের মধ্যে তরুণ-তরুণীরাই বেশি। প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করার মাধ্যমে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়া, বিপদে পড়ার কথা বলে সাহায্য চেয়ে মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করা, চটকদার পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষের অজ্ঞতা এবং বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে পণ্য না দেওয়া কিংবা ক্রয়কৃত পণ্যের পরিবর্তে অন্য কিছু দিয়ে দেওয়া, অধিক সুযোগ সুবিধার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা। এছাড়াও আইডি হ্যাক করে অর্থ আদায় করা, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষদের হয়রানি করাসহ ধর্মীয় উসকানির মাধ্যমে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করা, মিষ্টি মধুর কথাবার্তার মাধ্যমে সহজ সরল মানুষদের দিয়ে অপরাধজনক কর্মকাণ্ড করাসহ সকল অপরাধজনক কাজ করার জন্য ফাঁদ পাতে অপরাধীরা। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবসহ যেকোনো ইতিবাচক কাজ করার জন্য ফেসবুকের জুড়ি নেই। সকলেই এখন ফেসবুকে সক্রিয় থাকার কারণে সহজেই এবং কমমূল্যে যোগাযোগ করা, কথাবার্তা বলার অন্যতম মাধ্যম এখন ফেসবুক। আরও অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকলেও ফেসবুকের সহজলভ্যতার কারণে স্বল্পশিক্ষিত কিংবা সামান্য অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষও ফেসবুক ব্যবহার করতে পারছে। কিন্তু এর অপব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন।
ফেসবুকে অহরহ প্রতারিত হচ্ছে প্রতারক চক্রের দেওয়া বিজ্ঞাপন। ওইসব বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে, ৩৫-৪০ হাজার টাকা দামের সাইকেল মিলছে ৪ হাজার ৬০০ টাকায়! ১ হাজার টাকা বাড়িয়ে দিলেই পাওয়া যাবে বাংলাদেশের বাজারে না থাকা অত্যাধুনিক ইউরোপীয় সাইকেল! টাটা কোম্পানির মোটরযুক্ত সাইকেল বিক্রির অফার দিচ্ছে মাত্র ৭ হাজার টাকায়! শুধু তাই নয়, সোয়া লাখ টাকা দামের আইফোন দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার টাকায়! সঙ্গে ঘড়ি ফ্রি! তবে এজন্য ‘বিকাশ’ বা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে অগ্রিম পাঠাতে হবে মোট মূল্যের একটি অংশ। আর সারা বাংলাদেশে ওইসব পণ্যের ডেলিভারি দেওয়া হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ফেসবুকে এমন প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন এখন ভূরিভূরি। লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখো মানুষের টাকা। বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে ফোন দিলেই ব্লক করে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতার নম্বর। কখনো আবার টাকা পাঠিয়ে ফোন দিলে উল্টো করা হচ্ছে গালিগালাজ। ফেসবুক প্রতারণার অন্যতম টার্গেট নারীরা। নারীদের পোশাক বিক্রির লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে। তাতে আকৃষ্ট হয়ে কেউ অর্থ পাঠালে দেওয়া হচ্ছে নিকৃষ্ট এমনকি পুরনো অব্যবহারযোগ্য পোশাক। প্রতারক চক্র নগদ বা বিকাশসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবহার করছে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে। তবে এ দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাফ জবাব, অভিযোগ পেলেই তারা এ ধরনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। বিকাশ বা নগদের অ্যাকাউন্ট খুলতে যেহেতু জাতীয় পরিচয়পত্র লাগে সেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে প্রতারকদের খুঁজে বের করা কিংবা আইনের আওতায় আনা কঠিন কিছু নয়। এ ব্যাপারে অপরাধ দমনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো সক্রিয় হবেন- এমনটিই প্রত্যাশিত।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

