ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো: দরিদ্রতা ও বিশ্ব জয়ের গল্প
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:২৫
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো একজন খুব বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়। খুব অল্প সময়েই রোনালদো তার খেলার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত খেলোয়াড়। এমনকি আয়ের দিক থেকেও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী খেলোয়াড়ের তালিকায় তার নামটি সবার আগে আসে। কিন্তু এই উচ্চতায় পৌঁছতে রোনালদো তার জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৪৫ ঘন্টায় আট কোটি টাকা পর্যন্ত আয় করেন। স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকায় নিজের শরীরে কোনো ধরনের ট্যাটু করেননি। ফ্রি কিক মারার সময় তিনি ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতিতে দৌড়ায়, যা খুবই উচ্চ গতি। বল মারতে লাফ দেয়ার সময় চিতার চেয়ে বেশি শক্তি ব্যবহার করেন তিনি।
সংক্ষেপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো একজন পর্তুগিজ পেশাদার ফুটবলার, যিনি প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং পর্তুগাল জাতীয় দলে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলে থাকেন। প্রায়ই বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গণ্য রোনালদো পাঁচটি ব্যালন ডি’অর এবং চারটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু অর্জন করেছেন, যা কোন ইউরোপীয় খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড সংখ্যক জয়। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৩২টি প্রধান সারির শিরোপা জয় করেছেন, তন্মধ্যে রয়েছে সাতটি লিগ শিরোপা, পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, একটি উয়েফা ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, এবং একটি উয়েফা নেশনস লিগ শিরোপা।
রোনালদোর চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বাধিক ১৩৪টি গোল এবং ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বাধিক ১২টি গোলের রেকর্ড রয়েছে। রোনালদো অল্পসংখ্যক খেলোয়াড়দের একজন যিনি ১,১০০ টির উপর পেশাদার খেলায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং তার ক্লাব ও দেশের হয়ে ৭৯০টির বেশি গোল করেছেন। তার সেরা সাফল্য পর্তুগালের হয়ে ২০১৬ ইউরো জেতা। ২০১৫ সালেই পর্তুগালের ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হিসেবে রোনালদোর নাম ঘোষণা করেছে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন।
শৈশব কেটেছে অভাব অনটনে
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হোসে দিনিস আভেইরো ও মায়ের নাম মারিয়া ডোলোরেস ডস সান্তোস অ্যাভেইরো। মালী বাবা ও রাধুনী মায়ের ঘরের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান রোনালদো। আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যানের নাম থেকেই রোনালদো নামটা বেছে নিয়েছেন তার বাবা-মা। শৈশবটা অভাব অনটনে কেটেছে রোনালদোর। জায়গার অভাবে অ্যাভেইরো পরিবারের চার সন্তানই একই রুমে বেড়ে উঠেছে। আর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ফোর্বস সাময়িকীর সর্বোচ্চ আয় করা অ্যাথলেটদের তালিকার শীর্ষে ছিলেন রোনালদো।
১৪ বছর বয়সে ছাড়েন স্কুল
সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া রোনালদো কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি। রোনালদো ১৪ বছর বয়সে তার স্কুলের একজন শিক্ষকের দিকে একটি চেয়ার ছুড়ে মেরেছিলেন এবং এটি করার জন্য তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। শৈশব থেকেই ফুটবল খেলায় আগ্রহ ছিল তার। এই খেলায় নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিলেন। রোনালদোর পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তার মাও তাকে সমর্থন করেছিলেন।
শুরুতেই শঙ্কায় ছিল ক্যারিয়ার
ফুটবলার হওয়ার পথে তার মা তাকে অনেক সমর্থন করেছিলেন। তার মায়ের কারণেই তিনি একজন দুর্দান্ত ফুটবলার হয়ে উঠেছেন। হৃদস্পন্দনের সমস্যায় ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কায় পড়েছিলেন রোনালদো। অস্ত্রোপচার করে সে শঙ্কা কাটিয়ে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রোনালদোকে। ব্যক্তিগত জীবনে চার সন্তানের জনক রোনালদো। তার প্রথম ছেলে রোনালদো জুনিয়র ২০১৭ সালের জুনে এক বোন ও এক ভাই পেয়েছে সঙ্গী হিসেবে। আর ২০১৭ সালে বান্ধবী জর্জিনা রদ্রিগেজের গর্ভে রোনালদোর দ্বিতীয় কন্যার জন্ম হয়েছে।
ক্যারিয়ার ও রেকর্ডস
১৬ বছর বয়সে, তিনি পর্তুগালের স্পোর্টিং সিপি ক্লাবের অংশ হয়ে ওঠেন। দারুণ নৈপুণ্যে এক বছরের মধ্যে তিনি ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮, বি এবং ফাস্ট দলের হয়ে খেলতে শুরু করেন। এই ক্লাব থেকেই, তিনি ২০০২ সালে তার প্রথম প্রাইমিরা লিগা ম্যাচ খেলেন। মরেনস ফুটবল ক্লাবের বিপক্ষে এই ম্যাচে দুটি গোলও করেন তিনি। এই ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো এত ভালো পারফর্ম করেন যে অনেক ফুটবল ক্লাবের দৃষ্টি তার দিকে আকৃষ্ট হয় এবং বেশিরভাগ ফুটবল ক্লাবই তাকে তাদের দলের একটি অংশ বানাতে চায়। এই সময়ে স্পোর্টিং ক্লাবের দল এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাবের দলের মধ্যে একটি ম্যাচ হয়। এই ম্যাচে স্পোর্টিং ক্লাবের দল ৩-১ গোলে জয়ী হয় এবং এই ম্যাচে ক্রিস্তিয়ানো একাই ২ গোল করেন। এই ম্যাচের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাব তাদের দলে ক্রিস্টিয়ানোকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
পেশাদার ক্যারিয়ারের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস হয়ে আবারও ফিরেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবে। আর এ যাত্রায় গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন রোনালদো। মাত্র ৯ মৌসুম খেলেই লা লিগায় রেকর্ড ৩৩টি হ্যাটট্রিক তার। এতেই লা লিগায় দ্রুততম দেড়শ, দুইশ ও তিনশ গোলের রেকর্ডটি এখন রোনালদোর দখলে। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৬ মৌসুমে কমপক্ষে ৫০ গোল তার। টানা ৭ পঞ্জীকাবর্ষে ৫০ গোল করার রেকর্ডটিও শুধুই রোনালদোর। মেসির সঙ্গে যুগ্মভাবে ফিফার বর্ষসেরা দলে এগারোবার জায়গা পেয়েছেন, তবে রোনালদোই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুই ক্যাটাগরিতে ফিফার দলে নাম লিখিয়েছেন।
ইউরোপিয়ান ফুটবলে রোনালদোর আধিপত্য আরও ভয়ংকর। মোট ১২বার উয়েফার বর্ষসেরা দলে জায়গা পেয়েছেন রোনালদো। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মেসি যা করতে পেরেছেন মাত্র ৯ বার। এর পেছনে চ্যাম্পিয়নস লিগে রোনালদোর অর্জনই ভূমিকা রেখেছে। ইউনাইটেড ও রিয়ালের হয়ে চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পথে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এ প্রতিযোগিতায় ১০০ গোল করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট ক্লাবের হয়ে ১০০ গোল করা প্রথম ফুটবলারও রোনালদো। গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোল করার অনন্য অর্জনটিও শুধুই তার।
কিছু চকমপ্রদ তথ্য
বল মারতে লাফ দেয়ার সময় চিতার চেয়ে বেশি শক্তি ব্যবহার করেন তিনি। রোনালদো তার মাথার সাহায্যে মোট ১০৭টি গোল করেছেন, যার মধ্যে তিনি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলার সময় ৬৫টি গোল করেছেন। তিনি ফুটবল খেলার শুরুতে নিজের ওজন কিছুটা বাড়িয়েছিলেন। কম ওজনের কারণে খেলার সময় গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না।
ইউডি/অনিক

