নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী: কোন চাপের কাছে মাথানত করেনি বাংলাদেশ
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশিদের উপর নির্ভরশীলতার ‘অচলায়তন’ ভাঙতে পারার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার (২২ জুন) নিজের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ কখনো কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি, করবেও না বলেও দৃঢ় অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন তিনি। বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক
আগামীকাল শনিবার (২৫ জুন) উদ্বোধন হতে যাওয়া পদ্মা সেতুর কাজ এক দশক আগে শুরুর সময় এই প্রকল্পে যুক্ত ছিল বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থা। তখন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রকল্প থেকে সরে গিয়েছিল বিশ্ব ব্যাংক। টানাপড়েনের এক পর্যায়ে তাদের বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই কাজ শেষ করে চলতি মাসেই ওই সেতুতে গাড়ি উঠতে যাচ্ছে, রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাহস নিয়ে নিজেদের টাকায় নিজেরা পদ্মা সেতু করার ফলে আজকে বাংলাদেশের সম্মানটা ফিরে এসেছে। নইলে আমাদের দেশের সকলের একটা পারসেপশন ছিল, একটা মানসিকতা ছিল যে, আমরা অন্যের অর্থায়ন ছাড়া কিছুই করতে পারব না। এই যে একটা পরনির্ভরশীলতা, পরমুখাপেক্ষিতা এটাই কিন্তু আমাদের মাঝে ছিল। একটা দৈন্যতা ছিল। বিশ্ব ব্যাংক যখন এই টাকাটা তুলে নিয়ে গেল আমরা যখন সিদ্ধান্ত নিলাম, অন্তত আমরা সেই জায়গার থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি। সেই অচলায়তন ভেঙে আমরা যে একটা আত্মমর্যাদাশীল জাতি, আমরা যে পারি, সেটা প্রমাণ করতে পেরেছি।
নিজের ভাঁড় ভালো না, গোয়ালার ঘিয়ে দোষটা কী!
সেই সময় বিশ্ব ব্যাংকের সরে যাওয়ার পেছনে গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘প্ররোচনা’ থাকার কথা বলে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের বিষয়ে বলব ওই যে একটা কথা আছে না, ‘নিজের ভাঁড় ভালো না, গোয়ালার ঘিয়ে দোষটা কী!’ তারা বন্ধ করল কাদের প্ররোচনায়, আমাদের দেশেরই লোকের প্ররোচনায় তারা বন্ধ করেছিল, এটাইত বাস্তবতা। আমার তো কিছু বলার দরকার নাই। তারা নিজেরাইতো বুঝতে পারবে। যদি তাদের অনুশোচনা থাকে। আর না থাকলে কিছু আমার বলার নাই কারও বিরুদ্ধে।
পদ্মা সেতু নির্মাণে গুণগত মান নিয়ে কোন আপোষ করা হয়নি
শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ বা এর কাজের গুণগত মান নিয়ে কোন আপোষ করা হয়নি। এই সেতু নির্মিত হয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ দিয়ে। পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ২৫ তারিখে আমরা পদ্মাসেতু উদ্বোধন করবো, আমি দেশবাসী সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। কেননা, তাদের সাহসে সাহসী হয়েই নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করতে পেরেছি। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, উৎসব সবাই করবেন কিন্তু প্রত্যেকে একটু ধৈর্য্য ধারণ করবেন এবং নিয়ম মানবেন এবং কোথাও কোন দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখবেন। তিনি বলেন, যার যার জায়গা থেকে যেমন ভাবে হোক এই উৎসবে সবাই সামিল হবেন-এটা আমাদের মর্যাদার বিষয় যে আমরাও পারি। এটাই আমরা প্রমাণ করেছি কাজেই সেভাবেই সবাই উৎসবে সামিল হবেন।
কৃষি থেকে শিল্পায়নে যাচ্ছে বাংলাদেশ
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তার সরকার পদ্মা নদীর অন্যান্য অংশে (জাজিরা-শিবচর অংশ) কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার সরকার কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দেশে ও দেশের বাইরে খাদ্যের বাজার রয়েছে। আমরা ক্রমান্বয়ে কৃষি থেকে শিল্পায়নে যাচ্ছি এবং আমাদের বেশি করে ‘রেডি টু কুক’ পণ্যের শিল্প স্থাপনে উদ্যোগী হতে হবে।

বিশ্বব্যাংক অনুদান দেয় না, লোন নেই
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন সহযোগী হিসাবে বিশ্ব ব্যাংক থেকে যে আর্থিক সহায়তা আসে, সেটা তারা ‘অনুদান বা ভিক্ষা দেয় না’। বরং, ঋণ হিসাবে নিয়ে সেগুলো পরিশোধ করা হয়। বিশ্ব ব্যাংকের আমরা কিন্তু অংশীদার। তারা কিন্তু কোনো অনুদান দেয় না। আমরা লোন নিই, এটি কিন্তু সকলের মাথায় রাখতে হবে। আমরা কিন্তু সেখান থেকে লোন নিই, টাকা নিই। পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে গেলেও বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ হওয়া ওই অর্থ অন্যান্য প্রকল্পে আসার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, যে টাকাটা বাংলাদেশের নামে স্যাংশন হবে, সেই টাকাটা নষ্ট করবার কিন্তু কোনো রাইট তাদের নাই। হয়ত পদ্মা সেতু থেকে টাকা তারা বন্ধ করছে, টাকা কিন্তু উদ্ধার আমরা করতে পেরেছি। এবং এই টাকা কিন্তু অন্যান্য প্রজেক্টে ব্যবহার করতে পেরেছি। এটা কিন্তু করা যায়। এটা আমাদের অনেকে জানে না। জানি না, কেন জানে না। তিনি আরও বলেন, আমাদের যারা অর্থনীতিবিদ বা আমাদের যারা কাজ করে তারা এটা কেন মাথায় রাখে না যে, এরা কোনো দাতা না। আমি তাদের কাছ থেকে ভিক্ষা নিই না। ব্যাংকের একটা অংশীদার হিসাবে আমরা লোন নিই। এবং সুদসহ সেই লোন আমি পরিশোধ করি। কাজেই, আমার নামে, বাংলাদেশের নামে যে টাকা হবে সেই টাকা তাকে দিতে হবে, সে বাধ্য। এটা টাকা কোনো দিন বন্ধ করতে পারবে না। কাজে একটা প্রজেক্টের টাকা বন্ধ হয়ে গেলে, সেই টাকা নিয়ে চলে যাবে সেটা কিন্তু যেতে পারে না।

চাপের কাছে মাথানত করেনি বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে বলেছেন, বাংলাদেশ কখনো কোনো চাপের কাছে মাথানত করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না, বরং জনগণের শক্তিতে দেশ এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনো কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি, করবেও না। আমাদের যে আত্মবিশ্বাস আছে তা নিয়েই আমরা এগিয়ে যাব এবং জনগণের শক্তি নিয়েই দেশ এগিয়ে যাবে। মানবাধিকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবাধিকার আমাদের শিখাতে আসবে কারা যারা খুনীদের আশ্রয় দেয়, স্কুলে গুলি হয়, ছাত্র-ছাত্রী মারা যায়, রাস্তা ঘাটে পুলিশ মানুষকে গলায় পারিয়ে মেরে ফেলে তারা কি মানবাধিকার শেখাবে? তাদের উস্কানিতে আমাদের দেশের কিছু মানুষের আষ্ফালন (নাচানাচি) হবে এটা ঠিক কিন্তু আমরা আমাদের আত্মবিশ্বাস নিয়েই চলবো, জনগণের শক্তি নিয়েই চলবো।
নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি’র নেতা কে?
‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ সংক্রান্ত বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যখন একটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, জনগণের তাদের উপর এই আস্থা থাকতে হয়। নির্বাচনে তারা জয়লাভ করলে কে তাদের সরকারের প্রধান হবে-সেটা জনগণ আগে থেকেই জানতে চায়। তিনি বলেন, জনগণ প্রথম থেকেই এটা বিবেচনা করে। এটা শুধু আমাদের দেশেই ঘটে না, বরং বিশ্বব্যাপীই এমনটা হয়ে থাকে। তাদের (বিএনপি) নেতা হিসেবে কে নির্বাচনে অংশ নেবে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, তারা কি তাদের নেতা হিসেবে জনগণকে পলাতক (তারেক রহমান)-কে দেখাবে? তিনি তো দেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।
তিনি বলেন, সহজেই ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেতে কত টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে! কিভাবে একজন দন্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামী ব্রিটিশ নাগরিক হল- তা বের করতে সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যদি আপনারা এটা বের করতে পারেন, তবে সবকিছু বেরিয়ে আসবে। তাই, তারা (বিএনপি) কিভাবে নির্বাচনে অংশ নিবে এবং এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের ভুলটা কোথায়? তাদের দল এখনো বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে- যাদের এখন আর কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এছাড়া, অবশিষ্ট রইল বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো-যেগুলো অব্যহতভাবে বিভক্ত হতে হতে ছোট থেকে আরো ছোট হয়ে গেছে এবং এখন দলগুলো কখনো ডান দিকে কখনো বা বাম দিকে ঝুঁকে যায়। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তাই, আমাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কে আছে?

সব দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে হবে সংসদ নির্বাচন
সব রাজনৈতিক দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার জাতীয় সংসদে তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। এর আগে বিকাল ৫টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব রাজনৈতিক দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ দলীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করার পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সরকার ও নির্বাহী কর্তৃপক্ষের আবশ্যিক দায়িত্ব।
ঢাকা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা তার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের জন্য জাতির পিতার কন্যা হিসেবে আপনার কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি না; থাকিলে, তাহা কী?’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও সংসদকে জানান। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ দলীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে করার পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন সংবিধান ও প্রচলিত আইনের অধীনে সংসদ নির্বাচনসহ সব ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠু করতে বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আন্তরিক এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকবেন এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীনে হবেন। আইন অনুযায়ী কমিশন স্বাধীনভাবে তাদের কাজ সম্পাদন করে থাকে। নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সরকার সহায়তা করে থাকে। স্বাধীনভাবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সরকার ও নির্বাহী কর্তৃপক্ষের আবশ্যিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্রের বিকাশ ও অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্নের লক্ষ্যে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আন্তরিক এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে।
ইউডি/অনিক

