পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট-বাণিজ্যের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক
আশফিক রাসেল । শুক্রবার, ২৪ জুন ২০২২ । আপডেট ১০:৫০
বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলে হলে সিটবাণিজ্য বর্তমানে একটি অপসংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাথীর্দের অধিকার আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষা, শান্তি, মূল্যবোধ, উন্নয়ন, নিষ্ঠা, ঐক্য, সাম্য, প্রগতি প্রভৃতি মনভুলানো স্লোগান প্রচার করলেও এদেশে সব সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলো সাধারণ শিক্ষাথীর্র কাছে বরাবরই ত্রাসের নাম হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্নে ও প্রতিষ্ঠার পরেও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্ররাজনীতির বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকলেও বিগত কয়েক দশক ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈরাজ্য, অরাজকতা, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সাধারণ শিক্ষাথীর্দের লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত করা ব্যতীত জাতি তাদের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু পায়নি। আমরা দেখেছি রাজনীতির পরিচয়কে অপরাধের অস্ত্র ও শাস্তি ঠেকানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হলে হলে সিটবাণিজ্য, নির্যাতন, নিপীড়ন, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, অরাজকতা, রাহাজানি ও সন্ত্রাসের নরকরাজ্য গড়ার অসংখ্য নজির।
সম্প্রতি আবাসিক হলে সিটবাণিজ্য, হলের সাধারণ শিক্ষাথীর্র হয়রানি, নিপীড়ন ও শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহিদ তাজউদ্দিন আহমেদ সিনেট ভবনসংলগ্ন প্যারিস রোডে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষকদের উদ্যোগে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সন্তানতুল্য শিক্ষাথীর্র প্রতি অসীম দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই হোক বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোবৃত্তির কারণেই হোক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্রতিটি শিক্ষক জাতিকে নতুনভাবে পথ দেখিয়েছেন। আশার খোরাক জুগিয়েছেন। আফসোস যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি শিক্ষক এমন শিরদাঁড়াসম্পন্ন হতো তাহলে ক্যাম্পাসের ভেতর নৈরাজ্য সৃষ্টির দুঃসাহস কেউ কখনোই পেত না। আমার ভাবতে অবাক লাগে প্রশাসনিক পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ কতটা নীতিবিবর্জিত ও স্বার্থবাদী রাজনীতির নির্লজ্জ তোষামোদির মধ্যে ব্যস্ত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যেও অছাত্র-বহিরাগতরা বছরের পর বছর হল দখল করে রাখে! একথা অনস্বীকার্য, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি শিক্ষাথীর্র কাছে শিক্ষকরা হচ্ছেন তাদের মাথার তাজ সমান, অত্যন্ত শ্রদ্ধা-সম্মান ও আস্থা-নির্ভরতার প্রতীক।
আমরা জানি, যে কোনো দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় অর্জিত জ্ঞান শুধু জ্ঞানই নয়; অর্জিত জ্ঞানের স্বকীয়তা বজায় থাকে, যার মাধ্যমে মানুষের মনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। কিন্তু আজ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এদেশের ছাত্রসংগঠনগুলো জ্ঞানচর্চা ও মুক্তিবুদ্ধিবৃত্তির পথকে রূদ্ধ করতেই যেন মরিয়া! তাদের আজকাল ছাত্রদের অধিকার নিয়ে তেমন সোচ্চার হতে দেখা যায় না। এক জন নবীন শিক্ষার্থী যখনঅনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জগতে প্রবেশ করে তখন তার হাতেকলমের বদলে চাপাতিহাতুড়ি তুলে দেওয়া, ব্রেইনওয়াশের মাধ্যমে নিজেদের কুকর্মের সহযোগী বানানো এদেশে খুব প্রচলিত ব্যাপার। ক্ষমতার বলয় তাদের এতটাই শক্তিধর করে তুলে যে, সিনিয়র-জুনিয়র তোয়াক্কা না করে কারণেঅকারণে বৈধ আবাসিক শিক্ষাথীর্দের খবরদারি, হল থেকে বিতাড়ন, বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে হয়রানি ও নিপীড়ন, সিটবাণিজ্য বা চাঁদার বিনিময়ে নিজেদের পছন্দমতো কাউকে সিটে ওঠানো ও নামানো সবই যেন তাদের রুটিনওয়ার্ক। এভাবে হল প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অছাত্র ও বহিরাগতদের নেতৃত্বে অথবা একজন শিক্ষাথীর্র দ্বারা অপর শিক্ষাথীর্কে হল থেকে বিতাড়নসহ খবরদারির যে জঘন্য সংস্কৃতি আমাদের দেশে চালু হয়েছে এমন অসভ্যতা পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে চালু আছে কিনা আমার জানা নেই।
আজ আদর্শিক চর্চা নেই বলে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত দুর্বৃত্তরা একের পর এক অপরাধে জড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৈরাজ্য ও নিপীড়নের খবর যত বেশি পাওয়া যায়, এ সব অপরাধের দায়ে অপরাধীর শাস্তির দৃষ্টান্ত এর চেয়ে কম। কী করলে নৈরাজ্য কমিয়ে আনা যায়? দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, হাড়-শয়তানদের সমাজেও সুশাসন সম্ভব। এই সমাজেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৈরাজ্য কমানো যাবে, যদি যথাযথ বিধিব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। তাই হলগুলোতে সিটবাণিজ্যসহ সব ধরনের সহিংস অপরাধের রাস টেনে ধরার জন্য প্রথম কর্তব্য এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে গতি সঞ্চার করা। একটির পর একটি নৈরাজ্য সৃষ্টির খবরের সমান্তরালে যদি একটির পর একটি শাস্তির খবরও নিশ্চিত করা যায়, তাহলে নৈরাজ্যপ্রবণতা হ্রাস পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউডি/সুস্মিত

