প্রাণী গবেষণায় অনবদ্য ভূমিকা রাখবে পদ্মা সেতু জাদুঘর
আহমেদ শামিম । শনিবার, ২৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১০:০৫
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ২৫ জুন স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে দেশের সবজেলায় উৎসবের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে । তবে পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে আগেই সেই এলাকার জীববৈচিত্র্য জাদুঘরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৩৬৫ প্রজাতির প্রায় দুই হাজার নমুনা নিয়ে গড়ে উঠছে পদ্মা সেতু প্রাণী জাদুঘর। পদ্মা সেতু নির্মাণের পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় গড়ে উঠেছে পদ্মা সেতু জাদুঘর। গবেষকরা বলছেন, পদ্মা অববাহিকার বন্য ও জলজ প্রাণী নিয়ে গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখবে এই সংগ্রহশালা। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার দোগাছি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পদ্মা সেতু সার্ভিস এরিয়া-১-এ স্থাপিত ওই সংগ্রহশালাটির নাম পদ্মা সেতু প্রাণী জাদুঘর। এটি পদ্মা সেতু প্রকল্পেরই অংশ। বাস্তবায়ন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ।
পদ্মা নদীতে পাওয়া শুশুকের হাড় দিয়ে সাজানো হচ্ছে কংকাল। চকচকে চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে শিয়াল। ঝোপঝাড়ের ধেরে ইঁদুর খাবার ছিনিয়ে নিতে প্রস্তুত। মৃত প্রাণীর চামড়া দিয়ে বানানো নমুনা দেখে জীবন্ত ভাবতে পারেন যে কেউ। পদ্মা অববাহিকার জেলা শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের প্রাণী নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রাণী জাদুঘর। এই মুহূর্তে জাদুঘরটিতে জনসাধারণের প্রবেশের কোনো সুযোগ না থাকলেও ইতোমধ্যেই সেখানে দুই হাজারের বেশি নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও পদ্মাপাড়ের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে। এখানে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রাণিদেহের নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে নমুনাগুলো দৃষ্টিনন্দন ও দীর্ঘস্থায়ীও।
জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর মু নাইমুল নাসের বলেন, দুর্ঘটনাজনিত কারণে পদ্মা নদীর আশপাশ বা এই অঞ্চলে যেসব প্রাণী মারা গেছে তাদের আমরা এখানে এনে রেখেছি। আমরা কোনো প্রাণীকে মারিনি। সাত বছর ধরে এই সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে। জাদুঘরে রাখা প্রতিটি প্রাণী নমুনার সঠিক ও নির্ভুলভাবে নাম লেখা আছে। তাদের গোত্র পরিচয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং গবেষকদের জন্য এই জাদুঘরটি শিক্ষণীয় হবে। নইমুল নাসের বলেন, এত প্রাণী একসঙ্গে অন্য কোথাও দেখা সম্ভব নয়। তাই এই জাদুঘর জ্ঞানের আধার হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে ১০০ বছরের জন্য এটি উপহার হবে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর পরই জাদুঘরের মূল ভবন নির্মাণকাজে চলে যাব। ডিজাইন ইতোমধ্যে সম্পন্ন। এই ধরনের স্ট্রাকচার বাংলাদেশে আগে কখনো হয়নি, এটাই প্রথম হচ্ছে।
২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। পদ্মা অববাহিকার জেলা শরীয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলের পশু-পাখি নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রাণী জাদুঘর। জাদুঘরটিতে ৩৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৭৭ প্রজাতির পাখি, ৭৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও উভচর, ৩২৮ প্রজাতির মাছসহ প্রায় ১ হাজার ৪২০ প্রজাতির প্রাণীর নমুনা ছাড়াও বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবশেষ, ডিম, পরিত্যক্ত বাসা, মাছ ধরার সরঞ্জাম, বিভিন্ন ধরনের নৌকা ও বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য প্রাণীর প্রতিরূপ এই সংগ্রহশালাকে সমৃদ্ধ করেছে। পদ্মা সেতু জাদুঘরে ৩৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর ৯২টি নমুনা রয়েছে। এখানে ১৭৭ ধরনের পাখির ৪৪০টি নমুনা ছাড়াও ৪৭ জাতের সরীসৃপের ১৪৫টি, ২৮টি উভচর প্রজাতির ৫৫টি এবং ৩২৮ প্রজাতির মাছের ৩৪৩টি নমুনা রয়েছে।
এছাড়া ৩০৪ প্রজাতির শামুক-ঝিনুকের ৩১১টি নমুনা রয়েছে। ৬৩ প্রজাতির চিংড়ি-কাঁকড়ার ৭০টি এবং ১৮০ প্রজাতির প্রজাপতি ও মথের ২৩১টি নমুনা রয়েছে। ২০৯ ধরনের পোকামাকড়ের ৩৭৩টি নমুনাও রয়েছে। ৪৮ ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণীর ৬৬টি নমুনা ছাড়াও রয়েছে ১৬ ধরনের কঙ্কাল ও দেহাবশেষের ২২টি নমুনা। ১৭ ধরনের প্রাণীর ২৫টি ডিম, ২৯টি প্রাণীর ৪৮টি বাসা, ৬১ ধরনের মাছ ধরার ৭৩টি সরঞ্জামও রয়েছে। আছে ভিন্ন ভিন্ন ২০টি নৌকার নমুনাও। ১৪ ধরনের নৌকার ১৪টি সরঞ্জাম এবং ১৮ ধরনের বিভিন্ন প্রতিরূপ বা মডেলের ২৪টি নমুনাও রয়েছে।
জাদুঘরে রাখা প্রতিটি প্রাণী নমুনার সঠিক ও নির্ভুলভাবে নাম লেখা আছে। তাদের গোত্র পরিচয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং গবেষকদের জন্য এই জাদুঘরটি শিক্ষণীয় হবে। এত প্রাণী একসঙ্গে অন্য কোথাও দেখা সম্ভব নয়। তাই এই জাদুঘর জ্ঞানের আধার হবে। পরবর্তী প্রজন্ম যখন এখানে আসবে, তখন দেখতে পাবে পদ্মা নদীর আশপাশে কি ছিল। দায়িত্বশীলরা বলছেন, কিছু প্রাণী আছে এই এলাকার তালিকাভুক্ত করা কিন্তু অত্যন্ত দুর্লভ বলে এখানে পাওয়া সম্ভব না। যার কারণে অন্য এলাকায় যখন যে প্রাণী মারা যাচ্ছে তা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বছর দুয়েক আগে পদ্মায় ধরা পড়া প্রায় আড়াই কেজি ওজনের ইলিশটি সাজিয়ে রাখা হয়েছে কাচের বাক্সে। কাজুলি, উজুক্কু, শিং, আইড়সহ নানা প্রজাতির মাছের দেখা মিলছে এই জাদুঘরে। পদ্মার গলদা চিংড়ি, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ সাপসহ এই অববাহিকার বিলুপ্ত প্রায় বন্যপ্রাণী নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। মাছ শিকারের নানা উপকরণও সাজিয়ে রাখা হয়েছে থরে থরে। নতুন প্রজন্মের কাছে ১০০ বছরের জন্য এটি উপহার হবে।
ইউডি/সুস্মিত

