পদ্মা সেতু: এ যেন অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
আবদুল মান্নান । রবিবার, ২৬ জুন ২০২২ । আপডেট ১৪:১৫
পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিল করায় পদ্মা সেতু না হওয়ার জন্য সরকার, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবার দায়ী। আওয়ামী লীগ আমলে পদ্মা সেতু হবে না। আমরা ক্ষমতায় এলে একটা নয়, দুটি পদ্মা সেতু বানাবো। (বেগম খালেদা জিয়া। দৈনিক মানবজমিন, ৩০ জুন ২০১২)। পদ্মা সেতু বানানোর কোনও ইচ্ছা সরকারের ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল লুটপাট। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা কল্পনা বিলাস বাদ দিন। (ব্যারিস্টার মওদুদ। দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুলাই, ২০১২)।
যে পদ্মা সেতু নিয়ে এমন কথা আজ থেকে দশ বছর আগে অন্য অনেকের সঙ্গে বলেছিলেন তাদের প্রথম জন, বিএনপি প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কারাভোগ করছেন। অন্যজন বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত ক্ষমতাধর সদস্য ছিলেন। সংসদে দাঁড়িয়ে একবার বলেছিলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করা বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ তারা তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন। করোনাকালে তিনি পরলোক গমন করেছেন। বিশ্বব্যাংক যখন ২০১২ সালের ২৯ জুন নানা ধরনের বায়বীয় অজুহাতে পদ্মা সেতুতে প্রত্যাশিত ঋণ বাতিল করে, একই বছর ৮ জুলাই সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে। তাঁর এই ঘোষণাতে চারদিকে বেশ হাস্যরোল সৃষ্টি হলো।
যেহেতু যারা পদ্মা সেতু প্রকল্প হতে বিশ্বব্যাংক ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হতে সরে যাওয়ায় দুর্নীতির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে বেশ জোরেশোরে সরকার আর শেখ হাসিনার সমালোচনা করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে গেলো আর তাদের বক্তব্য স্বনামে বিভিন্ন মিডিয়া প্রচার করা শুরু করলো, তাদের নাম এখন নথিভুক্ত। তাই তাদের কয়েকজনের নাম পুনরুল্লেখ না করলেই নয়। এদের মধ্যে ছিলেন ড. আকবর আলি খান, ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, ড. এমাজউদ্দিন আহমদ, ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, ড. স্বপন আদনান, সাবেক আমলা ইনাম আহমদ চৌধুরী, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বদরুদ্দিন উমর, ড. হোসেন এইচ মনসুর, ড. সাদেক আহমেদ, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, ড. শাহদীন মালিক, ফরহাদ মাজহার, এম হাফিজ উদ্দিন খান প্রমুখ।
পদ্মা সেতুর কারিগরি দিক নিয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে অনেক কথা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে। কটি পিলার, তার শক্তি কেমন এসব নিয়ে হিসাব-নিকাশ হয়েছে দেশে ও বিদেশে। কিন্তু এসব হিসাব-নিকাশের বাইরে আছে সবচেয়ে বড় পিলার, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি তার নামে এই সেতুর নামকরণ করতে রাজি হননি। কিন্তু যতদিন বাঙালি আর বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন এই সেতুর ওপর দিয়ে মানুষ আর যানবাহন চলাচল করবে ততদিন শেখ হাসিনার নাম এই দেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে, যেমন আছে তাঁর পিতার নাম, যদিও তাঁর নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে কম চেষ্টা হয়নি। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল বানিয়েছিলেন। কোথাও তার নাম লেখা নেই। কিন্তু সাক্ষী আছে ইতিহাস। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটি বলা চলে।
জয়তু শেখ হাসিনা। আপনি পিতার মতো আবার প্রমাণ করেছেন বাঙালি নিজের প্রচেষ্টায় করতে পারে না এমন কোনও কাজ নেই। ত্রিশ লক্ষ মানুষ যদি তাঁর ডাকে নিজ দেশের জন্য নিজের জীবন দিতে পারে, তারা শুধু পদ্মা সেতু নয়, আরও এমন অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। প্রয়োজন শুধু আপনার মতো যোগ্য নেতৃত্ব। আপনি বাঙালিকে নিজের সক্ষমতার আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে সতর্ক থাকতে হবে এটি মাথায় রেখে যে যারা দেশের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন তাঁরা এই যাত্রায় হয়তো পরাজিত হয়েছেন, কিন্তু আগামীতে এই মানুষগুলোই ছোবল মারতে উদগ্রীব হয়ে থাকবেন না তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউডি/অনিক

