নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও সাভারে হত্যা: জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৯ জুন ২০২২ । আপডেট ১১:০৫
সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ভাবলেই ভয় হয়। জাতি গড়ার কারিগর একজন শিক্ষকই যখন সমাজে বারবার লাঞ্ছিত হয়, অপমানের শিকার হয় তবে ওই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে ভয়টা বেড়েই যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করেই শিক্ষকদের ওপর আঘাত বাড়ছে। এতোদিন লাঞ্ছিত করা হলেও এবার ঘটল হত্যার মতো ঘটনা। দেশে আইন আছে, আদালত আছে। আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়ার ক্ষমতা কারো নেই। তাই এসব বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনকে আরও কঠোর হতেই হবে। বিস্তারিত লিখেছেন মো. রুবেল
শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক হচ্ছে শ্রদ্ধার-স্নেহের। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বড় পাথেয় হচ্ছে শিক্ষকের সহচর্য। দিনকে দিন যেন এই ধারারই পরিবর্তন হয়ে পড়ছে। না হলে, প্রতিনিয়তই শিক্ষকদের কোনো না কোনো ঠুনকো বিষয়কে কেন্দ্র করে লাঞ্ছিত হতে হবে কেনো? নিকট অতীতে দেখা যায় ধর্মীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে লাঞ্ছনার পরিমাণ অনেক। এই ধরণের ইস্যুকে প্রাথমিকভাবে উসকে দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমেই। পরবর্তীতে স্থানীয় জনগন এসে পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে আসে। যার বড় প্রমাণ মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো। এটা একজন শিক্ষকের জন্য চরম অবমাননা বৈকি আর কিছুই না।
ওই ঘটনার রেস কাটতে না কাটতেই সম্প্রতি নড়াইলেও ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে আবারও চরম অপমানের শিকার হতে হলো এক শিক্ষককে। আর সাভারের আশুলিয়ায়তো শিক্ষার্থীর স্টাম্পের আঘাতে প্রাণ দিতে হলো শিক্ষককে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়েই শঙ্কা জাগছে।
নোংরা-পিছিয়ে পড়া সভ্যতা: বিশিষ্টজনরা বলছেন, এসব ঘটনাকে কোনো সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না। সভ্যতার উন্নয়নের নিচে আমরা যে অন্ধকার লালন করি, এই ঘটনা তার প্রমাণ। সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে আমরা যে একটি নগ্ন-নোংরা-পিছিয়ে পড়া সভ্যতা বহন করে চলেছি এ ঘটনা তারই প্রমাণ। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দেশের আইনের প্রতি সম্মান বাড়াতে হবে, কেননা শিক্ষক যদি কোনো অপরাধও করে সেটা আইন বিচার করবে, রাষ্ট্র বিচার করবে। সেখানে স্থানীয়ভাবে বিচার কত বড় অপরাধ তা শাস্তির মাধ্যমে বোঝাতে হবে। কঠিন শাস্তি না দিলে এ ধরণের ঘটনা আরও ঘটবে।
ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে সমাজ: ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা ও নড়াইলে এক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ১৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক। বিবৃতিতে তারা অত্যন্ত উদ্বেগের বলেছেন, বাংলাদেশের সমাজ ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পথ হারানোর আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে এই আহ্বান জানিয়েছেন ১৭ বিশিষ্ট নাগরিক। নাসির উদ্দীন ইউসুফ বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন।

সাম্প্রদায়িকসহ সব অপশক্তিকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে: বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান ঘটনায় প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশ আজ সাম্প্রদায়িকতার ছোবলে ক্ষতবিক্ষত। দেশে মানবিক মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত। সামাজিক মর্যাদা অদৃশ্য। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাম্প্রদায়িকসহ সব অপশক্তিকে কঠোর হস্তে দমন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিশিষ্ট নাগরিকেরা। তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির আলোকে শিক্ষা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সব কার্য সাধনে প্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।
বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি: এদিকে, এই দুই ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (২৮ জুন) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে এই কর্মসূটির আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সমাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠন অংশ নেয়। সমাবেশে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন, আমি শিক্ষক হিসেবে এখানে বক্তব্য দিচ্ছি, আমি জানি না কতটুকু নিরাপদ। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িকতাকে যদি শেকড় থেকে তুলে না আনা যায়, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।

পুরো জাতির জন্য বড় অপমান: এসব ঘটনাকে ন্যক্কারজনক উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার (২৮ জুন) সন্ধ্যায় মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানুর সই করা বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। স্বাধীন দেশে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে একজন শিক্ষকের সঙ্গে এমন অপমানকর ন্যক্কারজনক ঘটনায় মহিলা পরিষদ স্তম্ভিত, লজ্জিত, গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের ন্যক্কারজনক ও অপেশাদার ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। মহিলা পরিষদ মনে করে, শুধুমাত্র সংখ্যালঘু সম্পদায়ের প্রতিনিধি হওয়ার কারণে এমন অপমান ও বর্বরতার শিকার হতে হয়েছে এ শিক্ষককে। একজন শিক্ষকের প্রতি এ অপমান পুরো জাতির জন্য অপমান।
আশুলিয়ায় শিক্ষক হত্যার নেপথ্যে ‘কিশোর গ্যাং’: আশুলিয়ায় হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমারকে স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। স্থানীয়রা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী এলাকার কিশোরদের নিয়ে একটি ‘কিশোর গ্যাং’ পরিচালনা করে। মেয়েদের উত্যক্ত করার অভিযোগে কলেজে একাধিকবার তার বিচারও হয়েছে। গত ২৫ জুন দুপুরে সাভারের আশুলিয়ায় হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার ছাত্রীদের আন্তঃশ্রেণি ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় খেলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বিদ্যালয়ের পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের শিক্ষক এবং শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি উৎপল কুমার সরকার (৩৭)। সে সময় ওই স্কুলের দশম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী অতর্কিত একটি স্টাম্প দিয়ে উৎপল কুমার সরকারের ওপর হামলা করেন। স্টাম্প দিয়ে উপর্যুপরি উৎপল কুমারের পেট ও মাথায় আঘাত করে তাকে রক্তাক্ত করে। এরপর সেখান থেকে চলে যায়। এরপর সেই স্টাম্প হাতে কলেজের পেছনের মাঠে ঘুরলেও কেউ তাকে আটক করতে যায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুই দিনেও অধরা অভিযুক্ত সেই ছাত্র: শিক্ষক হত্যার ঘটনায় আশুলিয়া মডেল থানায় গত ২৬ জুন একটি মামলা হয়েছে। মামলার পর দুই দিন পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে আশুলিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম কামরুজ্জামান বলেন, আমাদের কয়েকটি টিম আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। একইসঙ্গে এই ঘটনায় আর কেউ যুক্ত ছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। আশা করছি দ্রুত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হবে। আলামত হিসেবে হামলায় ব্যবহৃত স্টাম্পটি জব্দ করার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘স্টাম্প জব্দ করা হয়েছে।’

শিক্ষক উৎপলের মৃত্যু ১৭ কোটি মানুষের জন্য লজ্জার-অপমানের: এদিকে, শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাঁরা এই হত্যার বিচার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, শিক্ষক উৎপলের মৃত্যু বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য লজ্জার, অপমানের। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারের সামনে এই মানববন্ধন হয়। কর্মসূচির আয়োজক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪১ ব্যাচ (২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষ)। উৎপল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাস করার পর তিনি আশুলিয়ার হাজি ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করেছিলেন। এই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ছিলেন।
নড়াইলেও ইস্যু ধর্ম: ইন্ডিয়ান ক্ষমতাসীন দলের বহিষ্কৃত নেত্রী নুপুর শর্মার সমর্থনে ফেসবুকে পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন দিনভর বিক্ষোভ, সহিংসতা চলে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে। গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। এরপর পুলিশি পাহারায় বিকাল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল মানুষ। ওই শিক্ষক হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেওয়া হয় পুলিশের গাড়িতে। স্বপন কুমার বলেন, কলেজে গেলে নতুন করে আবার হামলা হয় কি-না, সেই শঙ্কায় আছি। তারপরও কলেজে ফিরতে চাই। কারণ আমার পরিবার আছে, সন্তান আছে, তাদের ভরণ-পোষণের খরচ আমাকে বহন করতে হয়। কলেজের চাকরিই আমার আয়ের উৎস।

৯ দিন পর মামলা, গ্রেফতার ৩: অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনার ৯ দিন পর মামলা হয়েছে। এই মামলায় তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত সোমবার (২৭ জুন) মামলাটি করা হয়। অথচ ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ জুন। নড়াইল সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মাহমুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষক অবমাননা, ভাঙচুরের ঘটনায় সোমবার দুপুরে এসআই মোরসালিন মামলা করেছেন। মামলায় শাওন (২৮), সৈয়দ রিমন আলী (২২) ও মনিরুল ইসলাম রুবেল (২৭) নামে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শিক্ষক নিরাপদে রয়েছেন। তিনি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ অবস্থানে আছেন।
ইউডি/সুপ্ত

