রুয়ান্ডাজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা
ইমতিয়াজ পারভেজ । শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৪০
স্বাধীনতার পরপরই আফ্রিকার দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এ ক্ষেত্রে সেনেগাল ও মরক্কোর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনই আফ্রিকার সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। বিগত তিন দশকে আফ্রিকার বিরোধপূর্ণ ও গৃহযুদ্ধকবলিত বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী হিসাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা পেশাগত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় বাংলাদেশ নামটি আজ আফ্রিকা মহাদেশের সব দেশে সুপরিচিত। বর্তমানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আফ্রিকার কঙ্গো, সেন্ট্রাল আফ্রিকা, সুদানের দুটি অংশ, পশ্চিম সাহারা ও মালিতে জীবন বাজি রেখে নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে কর্তব্যরত রয়েছেন।
১৯৯০-এর দশকে রুয়ান্ডাকে বিবেচনা করা হতো গণহত্যা ও দুর্ভিক্ষের দেশ হিসাবে, যা হুতু ও তুতসি সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের কারণে ঘটেছিল। বর্তমানে আধুনিক রুয়ান্ডা একটি নতুন গল্পের সূচনা করেছে, যেখানে রুয়ান্ডা বিবেচিত হচ্ছে আফ্রিকায় সাফল্যের মডেল হিসাবে এবং দেশটিকে তুলনা করা হচ্ছে এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ সিঙ্গাপুরের সঙ্গে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক রুয়ান্ডাকে ‘উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নয়নে সফল’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। বিগত কয়েক দশকে আফ্রিকা রুয়ান্ডার বিস্ময়কর উত্থান প্রত্যক্ষ করেছে। রুয়ান্ডার মাথাপিছু আয় ১৯৯৫ সালে ছিল ১২৫ ডলার, যা বর্তমানে ৮ গুণ বেড়েছে। ২০০০ সালের পর দেশটিতে শিশুমৃত্যুর হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত কয়েক বছরে রুয়ান্ডাকে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির তকমা দেওয়া হয়েছে। রুয়ান্ডাবাসীর জীবনযাত্রার মানেও সূচিত হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। শিক্ষা হার, শিক্ষার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে। রুয়ান্ডার সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্য খাত সমগ্র আফ্রিকার মধ্যে বর্তমানে অন্যতম অগ্রসরমাণ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে-যেখানে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভবপর হয়েছে। কৃষি খাত রুয়ান্ডার অর্থনীতির প্রধান খাত এবং এর মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সূচিত হয়েছে। জমির ব্যাপক পুনর্বণ্টন, আধুনিকায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পদ্ধতিগত খাদ্যশস্যের রপ্তানি, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিদ্যার ওপর ভিত্তি করে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য উদারীকরণ, বিনিয়োগ সুরক্ষায় উন্নতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা অপসারণ এ উন্নয়নের ধারাকে আরও বেগবান করেছে।
পর্যটন রুয়ান্ডায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। এ খাতটি বড় বড় আন্তর্জাতিক হোটেল এবং বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দোকান স্থাপনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। রুয়ান্ডা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কেন্দ্র হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ ক্ষেত্রে দেশটি বেশকিছু আকর্ষণীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সুযোগ-সুবিধা উন্নত করা, অনলাইন ভিসা অ্যাপলিকেশন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অন্যতম। রুয়ান্ডা সরকার অবকাঠামো খাতে বড় আকারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিজনেস ইনডেক্সে রুয়ান্ডার বর্তমান অবস্থান ২৯, যা নির্দেশ করে রুয়ান্ডা বর্তমানে ব্যবসা করার জন্য ইউরোপের অনেক দেশের চেয়েও বেশি উপযোগী।
রুয়ান্ডাজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা। এ ভূখণ্ড হতে পারে ভোগ্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের বিশাল বাজার। সেখানে বিনিয়োগের জন্য প্রায় সব খাতই উন্মুক্ত। বাংলাদেশের জন্য রুয়ান্ডার ওষুধ ও প্রযুক্তি খাত হতে পারে বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র। অভ্যন্তরীণ কিছু আইনি জটিলতার কারণে বাংলাদেশিরা বহির্বিশ্বে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে। কিন্তু এখনই এ সম্ভাবনার বাজার ধরতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। আফ্রিকার দেশগুলোতে শান্তির কাজে নিয়োজিত থাকায় বাংলাদেশের রয়েছে অন্যরকম গ্রহণযোগ্যতা ও সুনাম। তাই বাংলাদেশের যে কোনো পণ্য বা ব্যবসার প্রতি থাকবে তাদের আস্থা ও বিশ্বাস। ভারতের ব্যবসায়ীরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কৃষিজমি লিজ নিয়ে ফসল উৎপাদন করছেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালও সেখানে বিনিয়োগ ও ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ের (জিটুজি) উদ্যোগ ছাড়াও দেশীয় বৃহৎ ব্যবসায়ী ও এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প রুয়ান্ডায় রপ্তানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত হতে পারে। সতর্কতার সঙ্গে বাজার বিশ্লেষণ এবং সম্ভাবনা যাচাই করে বিজিএমইএ এবং বড় পোশাক কোম্পানিগুলো এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
লেখক- সরকারি কর্মকরতা।
ইউডি/সুস্মিত

