বঙ্গবন্ধু টানেল: উন্মোচিত হবে হাজারো সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

বঙ্গবন্ধু টানেল: উন্মোচিত হবে হাজারো সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

মোহম্মদ রোকনুজ্জামান অঞ্জন । শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৭:০৫

২০২২ সালে দেশের বহুল প্রত্যাশিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প চালু হতে যাচ্ছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’। পদ্মা সেতু চালুর পর এবার বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধনের অপেক্ষা। সময় নির্ধারণ না হলেও আগামী ডিসেম্বরে পুরো কাজ শেষ করতে চায় টানেল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে বাকি রয়েছে প্রকল্পের ১৪ শতাংশ কাজ। তবে বর্তমান কাজের যে অগ্রগতি, এতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ইতিমধ্যে ৮৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের। পাশাপাশি টানেলের উভয়প্রান্তে অ্যাপ্রোচ রোডের কাজের অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ। এছাড়া টানেলের অভ্যন্তরে কমিউনিকেশন সিস্টেমসহ ভেন্টিলেশন ও অন্যান্য কাজের ৮ শতাধিক সরঞ্জাম আনা হচ্ছে চীনের সাংহাই থেকে। করোনার কারণে টানেলের বেশ কিছু সরঞ্জাম চীনে আটকে পড়ায় কিছুটা পিছিয়ে পড়ে কাজের অগ্রগতি। যদিও অন্যান্য কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, এ প্রকল্পে দুটি টিউবের খননকাজ শেষ হলেও বর্তমানে দুই টিউবের সঙ্গে ৬-৭ মিটার পর পর তিনটি ক্রস প্যাসেজের কাজ চলছে। যা শুধু চ্যালেঞ্জিং নয়, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণও। নির্মাণাধীন টানেলে বর্তমানে এ উচ্চ ঝুঁকির তিনটি ক্রস প্যাসেজের মধ্যে একটির কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অপর দুটির কাজও চলছে সমানতালে। প্রথম টিউবে পেভমেন্ট (রোড সার্ফেজ) স্থাপন কাজ এগিয়ে চলেছে। এটি শেষ হলে দ্বিতীয় টিউবে পেভমেন্ট স্থাপন করা শুরু করা হবে। এছাড়া প্রথম টিউবে লেনস্ল্যাব স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় টিউবেও লেনস্ল্যাব বসানোর কাজ ৮০ শতাংশ শেষ। দুই টিউব সংবলিত মূল টানেল হবে ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের। এর মধ্যে টানেল টিউবের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এবং ভেতরের ব্যাস ১০ দশমিক ৮০ মিটার। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম টানেল টিউবের বোরিং কাজ উদ্বোধন করেন। এরপর ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দ্বিতীয় টিউবের কাজ উদ্বোধন করেন। চীনের এক্সিম ব্যাংক ২ শতাংশ হার সুদে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করছে এ প্রকল্পে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার যোগান দিচ্ছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এ টানেল নির্মাণকাজ শেষ হলে এটিই হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কোনো নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম সুড়ঙ্গ পথ।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সংযোগ স্থাপিত হবে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্বপ্রান্তের প্রস্তাবিত শিল্প এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত চট্টগ্রাম শহর, চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরের সাথে উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হবে। ফলে ভ্রমণ সময় ও খরচ হ্রাস পাবে এবং পূর্বপ্রান্তের শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও প্রস্তুতকৃত মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর ও দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ হবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব প্রান্তের সাথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের ফলে পূর্বপ্রান্তে পর্যটনশিল্প বিকশিত হবে। সার্বিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজিকরণ, আধুনিকায়ন, শিল্পকারখানার বিকাশ সাধন এবং পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের ফলে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্প নির্মিত হলে বেকারত্ব দূরীকরণসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। কর্ণফুলী টানেল নির্মিত হলে এলাকার আশে পাশে শিল্পোন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। ফলে দারিদ্র দূরীকরণসহ দেশের ব্যাপক আর্থসামাজিক উন্নয়ন সাধিত হবে। ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফিনান্সিয়াল ও ইকোনোমিক আইআরআর এর পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এছাড়া ফিনান্সিয়াল ও ইকোনোমিক ‘বেনিফিট কস্ট রেশিও (বিসিআর)’ এর পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ১ দশমিক শূন্য ৫ এবং ১ দশমিক ৫। ফলে কর্ণফুলী টানেল নির্মিত হলে জিডিপিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পাহাড়,নদী আর সাগর-মোহনার অপরুপ সৌন্দর্যের রানী বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। দেশের অর্থনীতির চাকা সম্প্রসারিত করতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের মাধ্যমে চীনের সাংহাই নগরীর আদলে গেেড় উঠছে ‘ওয়ান সিটি সিটি-টু টাউন। প্রায় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে হাজারো অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। চার লেন বিশিষ্ট দুটি টিউব সম্বলিত ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার কর্ণফুলী নদীর তলদেশের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফিনান্সিয়াল ও ইকোনোমিক আইআরআর এর পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। টানেলের এক মাথা শুরু হয়েছে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির পাশ থেকে। নদীর তলদেশ দিয়ে তা চলে গেছে আনোয়ারার দিকে। এ টানেল ধরে চলে যাওয়া যাবে পর্যটননগরী কক্সবাজার ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর অবধি। মহেশখালীর মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি স্টেশন ও বাঁশখালীর কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে এই টানেল।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading