সিলেটে বন্যা: দুর্গতদের মাঝে ত্রাণবিতরণে সমন্বয় জরুরি
ফজলে এলাহী । রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৫:১০
সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি এখনো হয়নি। বন্যায় অনেকে চলে এসেছেন শহরের দিকে। অনেকে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন আশ্রয় কেন্দ্রে। অসহায় মানুষগুলো অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টে দিন অতিবাহিত করছেন। তাদের এখনো সহাঘ্যের প্রয়োজন। সিলেট শহর ও এর আশপাশে ত্রাণসামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা হলেও গ্রামাঞ্চলের অসহায় মানুষগুলোর অবস্থা খুব করুণ। সরাসরি না দেখলে অনুধাবন করা যায় না।
সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সড়কপথে বন্যার পানি উঠে যাওয়ার ফলে ত্রাণ পৌঁছানোও দুরূহ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বন্যার পানি অনেকটাই কমেছে। এর আগে সিলেট অঞ্চলের অধিবাসীগণ এমন অবস্থায় পতিত হননি। এর মধ্যে কিছু কিছু স্থানে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যাচ্ছে। কথা হলো, তপোবন আবাসিক এলাকার একজন বাসিন্দার সঙ্গে। তার বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক এলাকায়। ছাতকের বন্যাপরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। বাড়িঘরের টিনের চালের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হয়েছিল। জানা গেল, এখানকার কাজীহাটা গ্রামের ২২/২৩ বছরের তরুণীকে বন্যার পানি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। পরের দিন পার্শ্ববর্তী আমেরতল গ্রাম থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রথমত, অনেক সময় ত্রাণ বিতরণকালে দেখা যায়, একই পরিবারের বেশ কয়েক জন সদস্য ত্রাণ পেয়েছেন। অনেক পরিবারের কেউই পাননি। এটা মোটেই কাম্য নয়। ত্রাণ বিতরণকালে প্রতিটি পরিবারের জন্য এ পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী দেওয়া প্রয়োজন যাতে পাঁচ-ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিবার কমপক্ষে ১০/১২ দিন কষ্ট করে হলেও কাটাতে পারেন। কোনো গ্রামে বা এলাকায় ত্রাণ বিতরণের পূর্বে উক্ত গ্রামের বা এলাকার বিশ্বস্ত কয়েক জন ব্যক্তির মাধ্যমে ত্রাণ পাওয়ার উপযুক্ত পরিবারগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা এবং সেই তালিকা অনুযায়ী টোকেন প্রদান করা উচিত এবং ত্রাণ বিতরণের সময় উক্ত টোকেন অনুযায়ী পরিবারগুলোর যে কোনো একজন সদস্যকে ত্রাণবিতরণ করা প্রয়োজন। এতে ত্রাণের সঠিক বণ্টন সম্ভব হবে। প্রতিটি এলাকার মসজিদগুলোর ইমাম সাহেব এবং মুয়াজ্জিনগণকে উক্ত তালিকা তৈরি এবং টোকেন প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে উপযুক্ত পরিবারগুলোর কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি।
দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, ক্লাবের মাধ্যমে অথবা বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণের সময় সমন্বয়হীনতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। ত্রাণ বিতরণের সময় দেখা যায়, কোনো এলাকায় প্রচুর ত্রাণবিতরণ হয়েছে এবং অনেক এলাকায় হয়নি। এ সমন্বয়হীনতা নিরসনে উদ্যোগে ‘দুর্যোগকালীন ত্রাণবিতরণ’/ ‘ডিজএসটার রিলিফ ডিস্ট্রিবিউশন’ নামক একটি অ্যাপস তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন। যে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান যখন ত্রাণ দিতে যাবেন তখন খেয়াল রাখতে হবে, যেন কমপক্ষে একটি গ্রামের দুর্গত ও দুস্হ পরিবার ত্রাণ সহায়তা পায় এবং অসহায় কোনো পরিবার যেন বাদ না থাকে। অ্যাপসটির অ্যাডমিন পরবর্তী সময়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করবেন। তথ্য যাচাই-বাছাই এবং প্রকৃত অসহায় এবং দুর্গত পরিবার শনাক্তে উক্ত গ্রামের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিনের সাহাঘ্য নিতে পারেন। টোকেনের ব্যবস্থা করা হলে ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে, যা এখন অনেক বেশি পরিমাণে জরুরি।
শহরের আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্যসামগ্রী ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ সম্ভব হলেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যোগাযোগের অভাবে এখনো ত্রাণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং অনাহারে এবং অর্ধাহারে অনেকে মানবেতর অবস্থায় রয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তিগত, বিভিন্ন সংগঠন থেকে যে কোনো ব্যক্তি যেভাবে সম্ভব সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সিলেটে প্রবেশের মুখে ত্রাণসমন্বয় কেন্দ্র খুলতে পারে, যারা বিভিন্ন এলাকা থেকে ত্রাণ বিতরণে আসবেন, তাদেরকে তারা কোথায় কোথায় ত্রাণ দেওয়া হয়েছে ও কোথায় দেওয়া হয়নি, তা জানিয়ে দিতে পারেন।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

