আলাউদ্দিন আল আজাদের মৃত্যু বার্ষিকী আজ: বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক শব্দশিল্পী

আলাউদ্দিন আল আজাদের মৃত্যু বার্ষিকী আজ: বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক শব্দশিল্পী

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:৪০

“স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো, চারকোটি পরিবার, খাড়া রয়েছি তো! যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য, পারেনি ভাঙতে” প্রথম শহীদ মিনার ভাঙার প্রতিবাদে প্রথম কবিতা লিখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক প্রখর মেধাবী ছাত্র। নাম তার আলাউদ্দিন আল আজাদ। পরবর্তীতে তার হাতেই সৃষ্টি হয় গল্প-কবিতা, উপন্যাস, নাটক থেকে শুরু করে প্রবন্ধ, শিশু সাহিত্য, সাহিত্য গবেষণা, সাহিত্য সমালোচনা থেকে অজস্র বিষয়বস্তু। যিনি হয়ে উঠলেন এই বাংলার প্রথম সব্যসাচী সাহিত্যিক। কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক, কবি ও শিক্ষাবিদ আলাউদ্দিন আল আজাদকে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

আলাউদ্দিন আল আজাদ একজন শাণিত ভাষার লেখক ছিলেন। তিনি ছিলেন বাস্তব জীবনের রূপকার। একাধারে প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী ভাবধারায় সাহিত্যচর্চা। বাস্তবতার রূপ পরিগ্রহ করেছে তার ভাষা নির্মাণে। সংস্কৃতাশ্রয়ী শব্দ তিনি পরিহার করেছেন বলা চলে। তিনি প্রধানত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের রূপকার। তার গল্প নাতিদীর্ঘ।

হারানোর বেদনা ঘেরা শৈশব
আলাউদ্দিন আল আজাদের জন্ম ১৯৩২ সালের ৬ মে নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে। তার প্রথম জীবন ছিল কেবলই সংগ্রামের, হারানোর বেদনালিপ্ত। বাবা গাজী আব্দুস সোবহান, মা মোসাম্মাৎ আমেনা খাতুন। মাত্র এক বছর বয়সেই মাকে হারিয়েছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। আর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় হারিয়েছিলেন বাবাকেও। তারপর শুরু হলো তার জীবন সংগ্রাম। এরপর দাদীর কাছে বেড়ে ওঠা তার। কিন্তু গ্রামের সংসারে তখন ভীষণ অভাব। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা। মানুষ মারা যাচ্ছে না খেতে পেয়ে। একবার তার দাদীর খুব অসুখ। আর্থিক অনটন ও দুরাবস্থায় চিকিৎসক দেখাতে পারলেন না। রচনা প্রতিযোগিতায় যে সোনার মেডেল পেয়েছিলেন সেটাই ভৈরব বাজারে বিক্রি করে বাজার থেকে যখন ডাক্তার নিয়ে বাড়ি ফিরলেন দেখলেন দাদী মারা গেছেন।

শিক্ষাজীবন
রায়পুরেরই স্থানীয় নারায়ণপুর শরাফতউল্লাহ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা তথা ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন তিনি। সালটা ১৯৪৭। সে বছরই হলো দেশভাগ। তার ইচ্ছে ছিল তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হবেন। কিন্তু সেখানে আর্থিক ভাবনা। বাড়ি থেকে যে বের হবেন সে পয়সাও নেই তার। পরে একজনের থেকে ৩ টাকা ধার করে দৌলতকান্দি রেলস্টেশন থেকে ১ টাকায় কাটলেন ঢাকার টিকেট। আর সঙ্গে রইলো দুই টাকা আর টিনের স্যুটকেস। ঢাকায় গিয়ে কোথায় উঠবেন তার কোনো ঠিক নেই, কোথায় যাবেন তিনি! ঢাকায় ফুলবাড়িয়া স্টেশনে নেমে দিশেহারা হয়ে পড়লেন। অচেনা নগর, অচেনা মানুষজন। কিন্তু তার স্বপ্ন তখনো ঢাকা কলেজে পড়ার। কোথায় জুটবে পড়াশোনার খরচ, কোথায় জুটবে অন্য সংস্থান।

অবশেষে এক ঘোড়ার গাড়িওয়ালার আস্তাবলের পার্টিশন দেয়া একটি অংশে আশ্রয় জুটলো তার। ঢাকায় আসার কিছুদিনের মধ্যে তার পরিচয় হলো কবি শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। নিখাদ বন্ধুত্ব হয়ে গেল তাদের। তিনি ভর্তি হলেন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে কলা বিভাগে। ১৯৪৯ সালে কৃতিত্বপূর্ণ ফল করে জায়গা করে নিয়েছিলেন বোর্ডের মেধা তালিকায়। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে থাকার সময় কলেজের ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন তিনি।

সাহিত্য চর্চা
আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহিত্য চর্চার সূচনা হয়েছিল মাত্র ১৩ বছর বয়সেই। আর ১৯৪৬ সালে তথা বাংলা ১৩৫৪ সনে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকায় শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তার প্রবন্ধ ‘আবেগ’ এবং গল্প ‘জানোয়ার’। তখন তার বয়স মাত্র ১৪ বছর। যেখানে অন্য সবার সাহিত্য চর্চার সূচনা হয় কবিতা অথবা গল্প দিয়ে, সেখানে তার সূচনা হয়েছিল প্রবন্ধ দিয়ে। ১৯৫০ সালে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন মাত্র ১৮ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়েছিল তার গল্পগ্রন্থ “জেগে আছি”। ১৯৫১ সালে তিনি লিখেছিলেন গল্পগ্রন্থ “ধানকন্যা”। মূলত এই সময়টাতেই গড়ে উঠেছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। বাংলা বিভাগে শিক্ষক তখন নামজাদা সাহিত্যিক নাট্যকার ও ভাষাবিদেরা। তাদের ভীষণ স্নেহধন্য ছিলেন তিনি।

সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি কর্মজীবন
১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতকে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। সংবাদপত্রে খন্ডকালীন চাকরি করেছিলেন এই সময়ে। ১৯৫৪ সালের স্নাতকোত্তরেও প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। স্নাতকোত্তরে থাকাকালীন সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরের বছর নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে ১ বছরের বেশি থাকেননি। ১৯৫৬ সালে শিক্ষক হয়ে চলে এলেন জগন্নাথ কলেজে। এই সময়ে ঢাকা জেলা যুবলীগের সভাপতি ও পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সহসভাপতি ছিলেন তিনি। জগন্নাথ কলেজে থাকাকালীন সময়ে ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তার প্রথম নাটক “মরক্কোর জাদুকর”। একই বছর প্রকাশিত হয়েছিল তার প্রথম প্রবন্ধ সংকলন “শিল্পীর সাধনা”।

আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রথম উপন্যাস “তেইশ নম্বর তৈলচিত্র” প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৬০ সালে। প্রথম উপন্যাসেই সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। যেই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে নির্মিত হয়েছিল বিখ্যাত চলচ্চিত্র “বসুন্ধরা”। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হলো তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “মানচিত্র”।

সাহিত্য সম্ভার
এত অজস্র ব্যস্ততা সত্ত্বেও আলাউদ্দিন আল আজাদের সৃষ্টিকর্মের সম্ভার অবিশ্বাস্য। মোট ১১৮টি গল্প, ২৪টি উপন্যাস, ১২টি নাটক, ১১টি কাব্য গ্রন্থ, পাঁচটি প্রবন্ধ সংকলন, ত্রিশের বেশি সংকলিত গ্রন্থ, বিশের অধিক অনুবাদিত গ্রন্থ থেকে অজস্র সাহিত্য সমালোচনা। পঞ্চাশের দশকের প্রথম ভাগ থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত, টানা ৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বিস্তৃত ছিল আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহিত্য।

পরলোক গমন
২০০৯ এর ৩রা জুলাই শুক্রবার রাতে ঢাকার উত্তরায় নিজ বাসভবন রত্নদ্বীপে তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply