দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী । মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:২০
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যনগরী বা সমুদ্রবন্দর। বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবেও এ নগরী পরিচিত। ব্রিটিশ আমল থেকেই চট্টগ্রামের গুরুত্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে সব সময় বেশি ছিল। বেশ কয়েকটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হেড কোয়ার্টার ছিল চট্টগ্রামে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশের অন্য যে কোনো এলাকার চেয়ে চট্টগ্রামের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি ছিল। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচির একটা দফা ছিল নৌবাহিনীর হেড কোয়ার্টার চট্টগ্রামে করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রকল্পে গুরুত্বসহকারে অনুমোদন দিয়ে থাকেন। চট্টগ্রামের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগব্যবস্থা যা মহাসড়ক ও রেলওয়ের রাস্তা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবেও বিরাজ করছে।
সাধারণত দেখা যায় পরিকল্পনাবিদরা পরিকল্পনা করেন রাজধানীর সঙ্গে জেলা শহর, জেলা শহরের সঙ্গে উপজেলা শহরে কীভাবে যোগাযোগ করা যায়। এক সময় বাংলাদেশে ১৭টি জেলা ছিল। ১৭ জেলাকে ৬৪ জেলায় রূপান্তরিত করেছিল এরশাদ সরকার। আশির দশকে এরশাদ সাহেব ঢাকা-চট্টগ্রাম দুই লেনের রাস্তা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই মহাসড়ক চার লেনে রূপান্তরিত করেছে। এটার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে ধন্যবাদ। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেনের পরিকল্পনা না করে যদি ১০ লেন করা হতো তাহলে আজকের ভয়াবহ যানজট সমস্যায় পড়তে হতো না। দুর্ঘটনা কমানোর অজুহাতে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি মহাসড়ক এখন চার লেন করা হচ্ছে। আমরা এখন অনেকগুলো চার লেনের রাস্তা দেখতে পাই। যেখানে দৈনিক শতাধিক যানবাহনও চলে না। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মিনিটে শতাধিক যানবাহন আসা-যাওয়া করে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অত্র সড়ক ১০ লেন করা উচিত। পদ্মা সেতু যেমন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একই সেতুর নিচে রেল, ওপরে গাড়ি চলবে। অনুরূপভাবে ঢাকা-চট্টগ্রামের যোগাযোগের উন্নয়নে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে ভবিষ্যতে আর করা যাবে কি না সন্দেহ।
দেশের আমদানি-রপ্তানির লাইফ লাইন হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এখানে দেখা যায় কাঁচপুর ব্রিজ থেকে ঢাকা হানিফ ফ্লাইওভার পর্যন্ত ১০ লেনের রাস্তা আছে। অনুরূপভাবে মিরসরাই থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাস্তাকে ১০ লেন করতে হবে। আর বাকিটা আট লেন করলেই চলে। ভবিষ্যতে ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়বে। বিপুল মালপত্র আসবে। সেটা এখন থেকে মাথায় রাখতে হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-ভারত রামগড় মৈত্রী সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রামগড় থেকে চট্টগ্রামের বারইয়ার হাট পর্যন্ত এসে রাস্তা সংযোগ হবে। সেই বারইয়ার হাট থেকে নিয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অবশ্যই ১০ থেকে ১২ লেন রাস্তা করতে হবে। সরকারকে এদিকটায় নজর দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে টাকা নিয়ে পায়রা বন্দর সৃষ্টি হয়েছে। অনুরূপভাবে দরকার হলে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য বিকল্প হিসেবে একটা ডেডিকেটেড রোড বা এক্সপ্রেসওয়ে সরকার করতে পারে। সেটা দিয়ে কার্গো গাড়িগুলো চলবে। সড়কের ওপর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যারা, টেকনিক্যাল পার্সনরা আছেন, প্রকৌশলীরা আছেন, তারা ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু এখন সময়ের দাবি ঢাকা-চট্টগ্রামের রাস্তাটি অবশ্যই বড় করতে হবে। ইতোমধ্যে এই রাস্তা চার লেন করা হয়েছে যা পাঁচ বছরের মধ্যেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দেশের সব সড়কের চেয়ে অর্থনৈতিক দিক থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দশ লেন না করতে পারলে অন্তত আট লেন করা অতি জরুরি। অন্যথায় ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য এক্সপ্রেসওয়ে করতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন এক্সপ্রেসওয়েতে পরিণত হলে তাতে যে যানবাহনগুলো উঠবে সেগুলোকে বাড়তি টোল দিতে হবে। সেই টোলের টাকা দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির খরচ ওঠাতে বেশি সময় লাগবে না সরকারের। সেই দিকেও নজর দিতে হবে।
দেশের অর্থনীতির প্রাণ প্রবাহিনী শিরা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। চট্টগ্রামকে ঘিরে অনেকগুলো মেগা প্রকল্প সরকার করেছে। দেশের সিংহভাগ রাজস্ব আসে চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউস থেকে। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। বছরের পর বছর বন্দরের ব্যবহার যোগ্যতা বাড়ছে। কিন্তু চট্টগ্রামের যোগাযোগ সুবিধা তেমন একটা বাড়েনি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বৃহৎ প্রকল্পগুলোর সুফল পেতে হলে অবশ্যই ঢাকা ও চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত হওয়া প্রয়োজন। নইলে বঙ্গবন্ধু টানেলে অথবা বে-টার্মিনালের বিনিয়োগে সুফল আসবে না। চট্টগ্রামে দুটি স্পেশাল ইকোনমিক জোন, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরসহ কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে সরকারের কোনো পদক্ষেপই কার্যত পুরোপুরি সফলতা আসবে না। এ জন্য প্রয়োজন ১০ লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। প্রতিদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট লেগেই আছে। চার লেন দিয়ে লোকজন এখন নিশ্চিতে আসা-যাওয়া করতে পারছে না। এমনো দিন গেছে ৭-৮ ঘণ্টা লেগেছে গন্তব্যে পৌঁছতে। বাংলাদেশের আর কোনো রাস্তায় এত যানবাহন চলে না। সক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত গাড়ি ও ওজন নিয়ে চলার কারণে অর্থনীতির লাইফ লাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কটি এরই মধ্যে ভঙ্গুর দশায় চলে গেছে। অতএব এসব দিক থেকে বিবেচনা করে শুধু চট্টগ্রামের মানুষের দাবি না, বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে অবিলম্বে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করে নজর দেওয়া উচিত সরকারের।
ইউডি/সুস্মিত

