করোনা: ফের সামাজিক গণসংক্রমণ শুরুর শঙ্কা

করোনা: ফের সামাজিক গণসংক্রমণ শুরুর শঙ্কা

জাহিদুল হায়দার । শনিবার, ০৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৩:০০

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তিন সপ্তাহ ধরে ঊর্ধ্বমুখী। টানা ছয় দিন নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের বেশি ধরা পড়ছে। করোনার এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ফের সামাজিক সংক্রমণ শুরুর ইঙ্গিত বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সংক্রমণে এমন ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে আগামী সপ্তাহে দেশে করোনার চতুর্থ ঢেউ প্রবেশ করবে। এই সময়টায় পরীক্ষা বিবেচনায় রোগী শনাক্তের হার ১৭ শতাংশের বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দ্রæত বাড়লেও নমুনা পরীক্ষা বাড়ছে না। ফলে অধিকাংশই শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সারা দেশে ঘরে ঘরে সর্দি-জ্বর-কাশির রোগী। কিছু ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টও দেখা দিচ্ছে। এবারের করোনার উপসর্গও এগুলোই। কিন্তু নমুনা পরীক্ষায় মানুষের আগ্রহ না থাকায় এদের সবাই আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এদের প্রায় কেউই মাস্ক পরছেন না। জনসমাগম বেশি এমন স্থানে ঘোরাফেরা করছেন। ঘন ঘন হাত ধোয়া বা সামাজিক দূরত্বও রক্ষা করে চলছেন না। এ অবস্থায় প্রাণঘাতী এ ভাইরাস সামাজিক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি নতুন ঢেউ, কোথাও সামাজিক বা গুচ্ছ সংক্রমণ হবে। কোথাও কমবে, কোথাও বাড়বে এমনটা চলতে থাকবে। ফলে নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে দ্রæত চিকিৎসার আওতায় আসতে হবে। এ জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। এর আগে নো মাস্ক নো সার্ভিস চালুর কারণে ঢেউয়ের প্রকোপ কমছিল। সে বাধ্যবাধকতা এখন কঠোরভাবে আরোপ করতে হবে। নমুনা পরীক্ষা আরও বাড়াতে হবে। যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া যথাসময়ে টিকা নিয়ে নিতে হবে। মাস্ক পরিধান করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সামাজিক দূরত্ব। আর পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে

একাধিক জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, দেশে সরকারিভাবে ৫৬টি এবং বেসরকারিভাবে ১০৫টিসহ ১৬১টি আরটি পিসিআর পরীক্ষাগার রয়েছে। একইভাবে ৫৪টি সরকারি জিন এক্সপার্ট এবং বেসরকারিভাবে তিনটি মেশিন রয়েছে। এছাড়া ৫৪৫টি সরকারি ও ১১৭টি বেসরকারি র‌্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট মেশিনসহ করোনাভাইরাস শনাক্তে মোট ৮৮০টি নমুনা পরীক্ষাগার রয়েছে। যেখানে দৈনিক ৫০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। যেখানে দৈনিক অর্ধলাখের মতো নমুনা পরীক্ষা সম্ভব, সেখানে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন হচ্ছে, যা অধিদপ্তরের কাজের উদাসীনতা প্রমাণ করে। এতে করে অনেকে করোনা আক্রান্ত হয়েও শনাক্তের বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। এরা সামাজিক সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছেন।
স¤প্রতি করোনার সংক্রমণ বাড়লেও নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ার অন্যতম কারণ মানুষ পরীক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে না। নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন, কিট ও জনবল রয়েছে। এন্টিজেন, আরটি পিসিআর টেস্ট সব ব্যবস্থা আগের মতোই আছে। উসর্গযুক্তদের পরীক্ষা কেন্দ্রে আনতে সমন্বিত পদক্ষেপ ও প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো দরকার।

ঋতু পরিবর্তনের কারণে অনেকের সর্দি-জ্বর, গলাব্যথা, কাঁশি, শ্বাসকষ্ট বাড়ে। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও এসব হতে পারে। প্রশ্ন হলো-সাধারণ জ্বর, ডেঙ্গি জ্বর, সর্দি জ্বর ও করোনার জ্বর কোনটি সেটা নির্ণয় করতে পরীক্ষা করাতে হবে। সরকার বিনামূল্যে টিকা দিচ্ছে। এভাবে করোনা পরীক্ষাও ফ্রি করে দিতে পারে। মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে। পরীক্ষা বেশি হলে শনাক্ত বেশি হবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ কোভিড টেস্ট টিম করা যেতে পারে। এভাবে নমুনা পরীক্ষায় এখনই বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। নমুনা পরীক্ষায় মানুষের অনীহা থাকলেও টেস্টের সক্ষমতা কমেনি। সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় ব্যবস্থা রয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বাড়াতে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে চিকিৎসকদের। বর্তমানে কোভিড, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ডেঙ্গি এই তিন কারণে জ্বরসহ অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। এক্ষেত্রে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে গেলেই করোনা টেস্টের পরামর্শ দেওয়া উচিত। বর্তমানে ভাইরাসটির তীব্রতা ও মৃত্যু ঝুঁকি কম থাকায় নমুনা পরীক্ষায় অনেকের আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। পাশাপাশি নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে সরকারি পলিসি ও মানুষকে সচেতন করতে হবে। উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রথম দুদিনের মধ্যে এন্টিজেন টেস্ট করালেই পজিটিভ হবে না। নতুন ধরনের পরিবর্তন আসায় সুস্থ হওয়ার পরও করোনা থাকতে পারে। ফলে কখন পরীক্ষা করলে পজিটিভ হতে পারে, সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী করোনার কোনো ঢেউ চলার সময় শনাক্তের হার পর পর দুই সপ্তাহ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে সেই ঢেউ নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ধরা যাবে। আবার করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর দুই সপ্তাহ শনাক্তের হার ৫ শতাংশের বেশি হলে পরবর্তী ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধরা হবে। ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। প্রথম ঢেউ নিয়ন্ত্রণে আসে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। একই বছরের মার্চে ডেল্টা ধরনের করোনায় আসে দ্বিতীয় ঢেউ। এ পর্যায়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় গত জুলাইয়ে। একপর্যায়ে শনাক্তের হার ৩৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

লেখক- গবেষক।

ইউডি/সিফাত

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading