দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে ঈদযাত্রা হাক নিরাপদ
উম্মে জান্নাত মিম । শনিবার, ০৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫
ঈদুল আজহা সামনে রেখে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগেই ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে বাস ও ট্রেনের টিকিট কাউন্টারগুলোতে। বাড়তি চাপ আর ঝুঁকি এড়াতে যারাই সুযোগ পেয়েছেন, ছুটছেন বাড়ির পথে। ঘরমুখো অতিরিক্ত যাত্রীদের চাপে সড়কে গণপরিবহণ ও নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনা যেন এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার অদক্ষ ড্রাইভার, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া টিকিট কালোবাজারি, নির্দিষ্ট সময়ে পরিবহণ যাত্রা শুরু না করা ইত্যাদি তো রয়েছেই। এর বাইরে ছিনতাইকারী, ডাকাত ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যও মানুষকে বিপদে ফেলে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২১ অনুযায়ী, গত বছর সড়ক, রেল ও নৌপথে ৬ হাজার ২১৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং নিহত হয়েছে ৮ হাজার ৫১৬ জন, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা এবং এতে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ৮০৯ জন ও আহত ৯ হাজার ৩৯ জন। এসব দুর্ঘটনায় হতাহতদের ৭৮.৩৯ শতাংশ ১৫-৪৫ বছর বয়সের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং এতে বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি মোট জিডিপির ১.৫ শতাংশ। অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদ উপলক্ষ্যে দুর্ঘটনার পরিমাণ বেশি থাকে, যা মোট দুর্ঘটনার ১৫-২০ শতাংশ। এ সময় দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ মানুষের যাতায়াত বেড়ে যাওয়া, সড়কে যানবাহন বৃদ্ধি ও যাত্রীদের তাড়াহুড়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে মুভমেন্ট যত বাড়বে, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তত বেশি বাড়ে। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার যেসব কারণ রয়েছে, তা হলো ছোট যানবাহন বৃদ্ধি, রাস্তার পাশে অবৈধ দখল, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তাঘাটের ত্রæটি, পর্যাপ্ত ফুটপাত ও ফুটওভার ব্রিজ না থাকা, রাস্তার পাশে হাট-বাজার, রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ বাইপাস রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার বা অন্য কোনো কারণে অমনোযোগী থাকা, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, গাড়ি থামিয়ে বিপজ্জনক রাস্তা পারাপার ইত্যাদি।
স¤প্রতি প্রকাশিত ‘সেভ দ্য রোড’-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩ হাজার ১১০টিরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ১ হাজারেও বেশি মানুষ এবং আহত হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬২২ জন। এ ছাড়া নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১২২টি, আহত ৪৭৭ জন ও নিহত ২৪ জন। রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৯৭টি এবং আহত ১৭২, নিহত ১৭ জন। এ সংখ্যা জুলাই মাসে আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত ঈদের সময়টাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে দরকার সচেতনতা। এক্ষেত্রে গাড়িচালকদের নির্দিষ্ট গতিসীমায় গাড়ি চালাতে হবে, নিরাপত্তার জন্য সিটবেল্ট বাঁধতে হবে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে, নিরাপদ ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিতে হবে। এছাড়া লুকিং গ্লাস পর্যবেক্ষণ ও ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে যাত্রীদেরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, পথচারীদের উচিত রাস্তায় চলাচলের জন্য ফুটপাত-ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করা এবং সময় বাঁচাতে গিয়ে লাফ দিয়ে পরিবহণে না ওঠা। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গণপরিবহণের দরজায় ঝুলে বা ছাদে উঠে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকা।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারকেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন, প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কে ট্রাফিক সাইন স্থাপন করা, সংস্কারপূর্বক সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা, সড়ক নিরাপত্তার জন্য বাজেট বরাদ্দ ও আলাদাভাবে সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট গঠন, প্রতিটি রাস্তা-মোড় ও স্টপেজে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পরিবহণ চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ফিটনেসবিহীন গাড়ির চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিলকরণ, ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের ট্রেনিং প্রদান ইত্যাদি।
করোনা আক্রান্তের হার আবারও বাড়তে শুরু করেছে। তাই যাত্রাপথে যথাসম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। মুখে মাস্ক পরিধান, সাবান ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। একটু বাড়তি সচেতনতা বাঁচাতে পারে একটি প্রাণ। সব দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে এবারের ঈদযাত্রা সবার হোক নিরাপদ।
লেখক- শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ইউডি/সিফাত

