দেশের রফতানি বাণিজ্যে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব বাড়ছে

দেশের রফতানি বাণিজ্যে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব বাড়ছে

ফারহানা তাসনিম । বুধবার, ১৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:১০

ট্যানারি শিল্পে চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম কোরবানির ঈদ। এ সময়ের চামড়া অন্য সময় সংগৃহীত পশুর চামড়া থেকে উন্নতমানের। প্রতিবছর চামড়ার বার্ষিক চাহিদার সিংহভাগ জোগান আসে কোরবানির পশু থেকে। ফলে এ শিল্পের জন্য উন্নতমানের চামড়া কিনতে ব্যবসায়িরাও সময়টিতে ব্যস্ত থাকেন। কোরবানির সময় যে চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তা দিয়েই সারা বছর ট্যানারি শিল্পের কারখানাগুলো চলে। দীর্ঘদিনেও বাংলাদেশে চামড়াশিল্প এগিয়েছে অনেকটা ঢিমেতালে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শিল্পটি কিছুটা গুরুত্ব পেতে থাকে। বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাত থেকে সরকার প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।

প্রতিবছরই পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শতশত কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর ঋণ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এসব ঋণের বিষয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। আগেকার কোনো খেলাপি প্রতিষ্ঠান যেন ঋণ না পায়, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে সতর্ক থাকে। ট্যানারি শিল্পের বার্ষিক চামড়ার মোট চাহিদার ৭০-৮০ ভাগই সংগ্রহ করা হয় কোরবানির পশু থেকে। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ চামড়া সরবরাহ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ সময় সব চামড়া নিজেদের নগদ অর্থে কিনতে পারেন না। এ কারণে তারা এসে ধরনা দেন ব্যাংকগুলোতে, বিশেষ করে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে। চামড়া কিনতে সাধারণত এক বছর মেয়াদে ঋণ দেওয়া হয়। এ ব্যবসায় জড়িত গ্রাহকরা তা পেয়ে থাকেন। চামড়া খাতে বিতরণ করা ঋণের একটা বড় অংশই বছরের পর বছর খেলাপি হয়ে আছে। এসব কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো চামড়া কেনায় ঋণ দিতে আগ্রহ দেখায় না, যদিও বর্তমানে এখাতে ঋণ আদায়ের হার আগের তুলনায় ভালো। ব্যাংকগুলো সতর্কতার সঙ্গে ঋণ অনুমোদনের ফলে খেলাপির পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক কমে আসছে ইদানিং।

এ পর্যন্ত চামড়া খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। আগের দেওয়া ঋণ খেলাপি হলেও ঋণ পাবেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে পুনঃতফসিল করা যাবে। অর্থাৎ, ঋণ খেলাপিরাও ঋণ পাবেন। এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম গত বছরের চেয়ে একটু বাড়তে পারে। এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ট্যানাররা ৪০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ঋণ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। তবে এবারের কোরবানি ঈদে পশুর কাঁচা চামড়া কিনতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব চারটি ব্যাংক।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, ৯০ শতাংশ ট্যানারি বন্ধের পথে। চামড়া রপ্তানি না হওয়ায় ট্যানারিগুলো আর্থিক সংকটে পড়ছে। এতে ঋণের সুদ বাড়ছে। কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে বেশির ভাগ ট্যানারি খেলাপি হবে। এ সংকট উত্তরণে সরকারের সহায়তা দরকার। উদ্যোক্তরা বলেছেন, পরিবেশবান্ধব চামড়া উৎপাদনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যাংকঋণে তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হোক। ট্যানারি মালিক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ স্থিতি পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত, সেসব প্রতিষ্ঠানকে দায়দেনা পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর সময় দেওয়া যাবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ স্থিতি পাঁচ কোটি টাকার বেশি, তাদের দায়দেনা পরিশোধের জন্য সময় দেওয়া যাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। পরিবেশবান্ধব চামড়া উৎপাদনের লক্ষ্যে শিল্প স্থানান্তর করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা অপরিকল্পিতভাবেই হয়েছে। এ কারণে ইউরোপের বাজার হারাতে হয়েছে। এরপর চামড়া খাতে রপ্তানির বড় বাজার ছিল চীন। একক দেশ হিসেবে চীনে ৬৫ শতাংশ চামড়া ও চামড়াপণ্য রপ্তানি করা হয়। এ সময়ে যে পরিমাণ ঋণপত্র, রপ্তানি আদেশ ও পণ্য সরবরাহ হওয়ার কথা, মহামারীর কারণে তা হয়নি। এতে ব্যবসায়ীরা নতুন করে সংকটে পড়েছেন। ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৫টি মাঝারি ট্যানারি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সঙ্কট কাটাতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই চামড়া খাতের রপ্তানি বাড়বে। চামড়া শিল্পে চীনের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এদেশে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে চামড়া শিল্পে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে বাংলাদেশ। এ খাতে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এর মাধ্যমে। পরিবেশবান্ধব আধুনিক চামড়া শিল্প গড়ে আমাদের অর্থনীতিতে আরো চাঙ্গাভাব সৃষ্টি করা যায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুণগত মানের চামড়া, সস্তা মজুরির শ্রমিক ও কাঁচামালের সহজপ্রাপ্যতাসহ অন্যান্য তুলনামূলক সুবিধা ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারা জোরদার করতে চামড়া শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, প্রশিক্ষণ সুবিধার প্রসার ও বিদেশি ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে ট্যানারি শিল্পে গুণগত পরিবর্তন আনার জোরালো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বেশি রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে আরো মজবুত করতে হলে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। চামড়া খাত যদি পোশাক খাতের মতো সমান সুবিধা পায়, তাহলে এই খাত থেকে বছরে এক হাজার কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি করা সম্ভব।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading