দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নবজাগরণ আনবে পদ্মাসেতু
রেজাউল করিম খোকন । বুধবার, ১৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:১৫
পদ্মাসেতু চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে। পদ্মাসেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকার সংযোগের মাধ্যমে সম্ভাবনার আরেক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্য স্বল্প সময়ে বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। সম্প্রসারিত শিল্পায়নের ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। আবাসন ও পর্যটন খাতে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। এভাবেই ২১ জেলার মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি গতিশীল করতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে পদ্মাসেতু। তিন বিভাগের অন্তত চার কোটি মানুষ উপকার পাবেন। আর জিডিপির হার বাড়বে এক থেকে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ। জিডিপি পরিমাণে বাড়বে প্রায় ৭৩-৭৪ হাজার কোটি টাকা।
পদ্মাসেতু ঢাকা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শুধু বদলে দেবে না, বদলে দেবে গোটা অর্থনীতিকে। এই সেতুর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠেছে খুব দ্রুতই। এই সেতুর সুবাদে জিডিপি অবদান বাড়লে স্বাভাবিকভাবে তা দারিদ্র বিমোচনে সহায়তা করবে। এডিবির প্রতিবেদনে জিডিপির হার বাড়বে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। পদ্মার ওপারে ২১ জেলায় ১৩৩টি উপজেলা রয়েছে। এসব উপজেলার মধ্যে ৫৩টি উচ্চ দারিদ্র ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি বরিশাল বিভাগে। এছাড়া ৪২টি উপজেলা মধ্যম দারিদ্র এবং ৩৮টি নিম্ন দারিদ্র ঝুঁকিতে আছে। পদ্মাসেতু চালুর পর ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হলে ওই এলাকার মানুষের আয় বেড়ে দারিদ্র বিমোচন হবে। দেশে আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু আছে। এর মধ্যে পদ্মার ওপারে শুধু মোংলা ইপিজেড। পদ্মাসেতুকে ঘিরে যশোর ও পটুয়াখালিতে আরও দুটি নতুন ইপিজেড করা হচ্ছে। এতে এ অঞ্চলে রপ্তানিমুখি খাতে নিয়োগ হবে, বাড়বে কর্মসংস্থান। বিভিন্ন কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পের তেমন বিকাশ হয়নি এতোদিন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের বড় সমস্যা ছিল। পাশাপাশি বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-সাইক্লোন প্রতিরোধী অবকাঠামোর মাধ্যম ভূমির উন্নয়ন ঘটিয়ে অর্থনৈতিক এলাকা করা গেলে আমাদের অর্থনীতির মূলধারার খাতের শিল্পদ্যোক্তারা এ অঞ্চলে বিনিয়োগে আকৃষ্ট এবং মনোযোগী হবেন। পদ্মাসেতু হওয়ায় পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের আরো কার্যকর ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এখন দুটি বন্দরে এবং বিভিন্ন নতুন অবকাঠামোর উন্নয়নের গতি দ্রুত হলে আমরা কাক্সিক্ষত ফল পাবো। ট্র্যান্স-এশিয়ান রেলওয়ে ও হাইওয়েতে কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, নেপাল, ভুটানের জন্য একটি উপআঞ্চলিক সংযোগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে পদ্মাসেতু। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ এই পুরো অঞ্চলে একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
পদ্মাসেতু নির্মাণের পর থেকে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিজমিতে শিল্প স্থাপনের চেষ্টা শুরু হয়েছে। এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণাঞ্চল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে এ অঞ্চল ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ততা বাড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপও বেশি এ অঞ্চলগুলোতে। কৃষিজমি শিল্পে কতোটা ব্যবহার করা যাবে, তার একটি নিয়ম আছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পের জন্য জমির বরাদ্দ দিলে কৃষিজমি যেমন বাঁচবে, তেমনি বিনিয়োগকারীরাও এক জায়গায় সব ধরনের সুযোগ সুবিধাগুলো পাবেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু উত্তরাঞ্চলে নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল। বগুড়া থেকে শুরু করে রংপুর, রাজশাহী অঞ্চলে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। পদ্মাসেতু এখন দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক বা শিল্পের নতুন করিডর গড়ে তোলার পথ খুলে দিয়েছে। পদ্মাসেতু চালু হওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে আশা করা যায়। পদ্মাসেতু শুধুমাত্র যান চলাচলের জন্য নয় এই সেতুর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। এখন যদি ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ে তাহলে সেতু থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি আসবে না।
ইউডি/সুস্মিত

