স্বপ্ন পূরণের পথে মেট্রোরেল
শিবলী হায়দার । শুক্রবার, ১৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:০৫
মেট্রো রেল মূলত একটি দ্রুত পরিবহণব্যবস্থা যা বিশ্বের অনেক বড় শহরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় গণপরিবহণের জন্য ‘ঢাকা মেট্রো রেল’ হলো ‘জাইকা’-এর অর্থায়নে একটি সরকারি প্রকল্প। প্রকল্পটি রাষ্ট্রায়ত্ত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) পরিচালনা করছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২০০৪ সালে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গড় গতি ছিল প্রায় ২১ (২১.২ কিমি/ঘণ্টা), কিন্তু ২০১৫ সালে তা ৬ (৬.৮ কিমি/ঘণ্টা) এ নেমে আসে। ফলস্বরূপ, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাসে যেতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার বেশি। মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট। এটি প্রত্যাশিত যে এ ধরনের পরিবহণ মানুষের জীবনধারা পরিবর্তন করে এবং তাদের উৎপাদনশীল সময় বৃদ্ধি করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মেট্রো রেল বিশ্বের অনেক বড় শহরে গণপরিবহণের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে প্রথম দ্রুত ট্রানজিট সিস্টেম চালু করা হয়েছিল, যা এখন ‘লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর একটি অংশ। ১৮৬৮ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এনওয়াইতে তার প্রথম দ্রুত ট্রানজিট রেলব্যবস্থা চালু করে এবং ১৯০৪ সালে, নিউইয়র্ক সিটি সাবওয়ে প্রথমবারের জন্য খোলা হয়েছিল। এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে, জাপান হলো প্রথম দেশ যেটি ১৯২৭ সালে একটি পাতাল রেলব্যবস্থা তৈরি করে। ভারত ১৯৭২ সালে কলকাতায় তার মেট্রো সিস্টেম নির্মাণ শুরু করে। এর পরে, ভারত অন্যান্য শহরেও মেট্রো রেলব্যবস্থা তৈরি করে। বর্তমানে, বিশ্বের ৫৬টি দেশের ১৭৮টি শহরে ১৮০টি পাতাল রেলব্যবস্থা চালু রয়েছে।
রাজধানীতে যত সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে যানজট সমস্যা অন্যতম। এর ফলে নগরবাসীর কেবল কর্মঘণ্টাই নষ্ট হয় না, তাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কাটিয়ে দিতে হয় নগরবাসীকে। যানজট সমস্যা নিরসনের জন্য সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। রাজধানীতে নির্মাণ করা হয়েছে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। এছাড়াও সরকার পাতাল রেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দীর্ঘদিনের নাগরিক দুর্ভোগ কমাতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশার কথা, চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেট্রোরেল এবং আগামী ২০২৩ সালের শেষের দিকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করা সম্ভব হবে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, এক্সপ্রেসওয়ের কাজে আগে ধীরগতি ছিল, এখন গতি বেড়েছে। সরকার এই প্রকল্পের অর্থায়নের সমস্যাটা দূর করেছে।
উত্তরায় মূল ডিপোটি মাটিতে থাকলেও, পুরো রেলপথটি উডাল। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। মেট্রোরেল পুরোপুরি বিদ্যুৎচালিত রেল। বাংলাদেশে এই প্রথম বিদ্যুৎচালিত কোনো রেল চালু হতে যাচ্ছে। এটা রাজধানীবাসীর জন্য আনন্দের খবর। বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি মেট্রোরেল। এটি চালু হলে ঢাকার প্রবল যানজট সমস্যার অনেকাংশে সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ইতিপূর্বে কোনো মেট্রোরেল ছিল না। এই সরকারই প্রথম উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর কৃতিত্ব বর্তমান সরকারেরই। টিকেট কাটা, ট্রেনে চড়া, দাঁড়ানো, নামা, ট্রেনের ভেতরে এবং স্টেশনের নির্দেশিকাগুলো কেমন থাকবে- এসব বিষয়ে মানুষকে ধারণা দিতে এমআরটি তথ্য ও প্রদর্শনী কেন্দ্রে নমুনা ট্রেন থাকবে। এ ব্যাপারে আমরাও আশাবাদী। তবে অনেকেই অভিযোগ করেন, রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করেও যানজট নিরসন করা সম্ভব হয়নি। বরং ক্ষেত্র বিশেষে যানজট বেড়েছে, বেড়েছে জনদুর্ভোগ। দেশের সচেতন জনসাধারণের প্রশ্ন, মেট্রোরেল চালু হলে যানজট কমবে তো?
মেট্রো রেল পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর লোকবলের প্রযয়োজন হবে, যা বাংলাদেশে অনেক কাজের সুযোগ তৈরি করবে। ইউএনবির মতে, প্রতিটি মেট্রো রেলস্টেশনে একটি অপারেটিং রুম, টিকিট কাউন্টার, লাউঞ্জ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট, প্রার্থনার স্থান, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা, এসকেলেটর, লিফট এবং আরও অনেক কিছু থাকবে। কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নতুন কর্মচারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। তা ছাড়া, স্টেশনগুলোর আশপাশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ব্যবসা পরিচালনার জন্য একদল কর্মীর প্রয়োজন হবে। এসব কর্মসংস্থান আর্থিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি করবে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। মেট্রো রেলের কারণে, ট্রানজিট ব্যবস্থা বাড়বে, এবং স্টেশনগুলোর আশপাশে অসংখ্য ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত ব্যবসা গড়ে উঠবে।
আমরা মনে করি, মেট্রোরেল চালু হলে একদিকে যেমন রাজধানী আরো আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন হবে, অন্যদিকে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এ ব্যাপারে নগরবাসীর কৌতূহলও রয়েছে। এটা সত্য মেট্রোরেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাদের নেই। যারা কলকাতায় গিয়েছেন, তারা পাতাল রেল ভ্রমণ করে আনন্দ পেয়েছেন। এই আনন্দ এবার নগরবাসী রাজধানী ঢাকাতে নিতে চায়। ২৫ জুন উদ্বোধন হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। তারা এখন কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে। এটা বর্তমান সরকারের সাফল্য। এরপর কর্ণফুলী সেতুর উদ্বোধন হবে। সরকারের এসব বড় বড় প্রকল্প দেশের উন্নয়নের মাইলফলক। দেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে এসব তার বড় প্রমাণ। মেট্রোরেলের মাধ্যমের নগরবাসীর দুর্ভোগ কমে আসুক এই প্রত্যাশাই করছি।
ইউডি/সুস্মিত

