অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা দিচ্ছে প্রযুক্তির অগ্রগতি
আদনান ইমতিয়াজ । শুক্রবার, ১৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:২৫
বাংলাদেশের মানুষের জীবনধারা স্বপ্নিল গতিতে আধুনিকায়ন হয়েছে। গত এক দশকের ব্যবধানে প্রযুক্তির জাদুর স্পর্শ শহরের পাশাপাশি আবহমান বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপথকেও রাতারাতি পরিবর্তিত করে উন্নত দেশের সমান সুযোগ-সুবিধাযুক্ত লোকালয়ে পরিণত করেছে। করোনাভাইরাসের দুর্যোগের সময়ে বাংলাদেশের আপামন জনসাধারণ তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে জীবনধারা সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বে এ যাবৎ আবিষ্কৃত প্রযুক্তির বেশির ভাগেরই কোনো না কোনো পর্যায় বাংলাদেশে ব্যবহার হয়ে থাকে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়ছে। থ্রি-জি ফোর-জি পেরিয়ে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক যেমন চালুর দ্বারপ্রান্তে; তেমনি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট এখন মহাকাশে সক্রিয় থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি কাজ বৈদেশিক নির্ভরতা মুক্ত করে সুসম্পন্ন করে চলছে। বাংলাদেশের মতো বিশে^ আর কোনো উন্নয়নশীল দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে এত স্বল্প সময়ে নিজস্ব পরিকল্পনায় ডিজিটাইজ হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রযুক্তি বিশ্বে অর্জন করে নিয়েছে নিজেদের একটি সম্মানজনক স্থান। বিশেষজ্ঞরা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক এই উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে আখ্যায়িত করছেন ডিজিটাল নবজাগরণ হিসেবে। দেশে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার সঙ্গে মানুষের জীবনে এর বড় প্রভাবও দেখা গেছে। ২০০ বছরেরও অধিককাল ধরে প্রচলিত বিচারিক কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশন করেছে সরকার। সাইবার হয়রানি রোধে একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এই কর্মসূচির আওতায় একটি হেল্পলাইনও চালু করা হয়েছে। পাঠাও-উবারের মতো স্টার্টআপ চালু হয়েছে। এরই মধ্যে শতাধিক স্টার্টআপ কোম্পানিকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। সরকার কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, অধিকতর উন্নত জনসেবা প্রদানের জন্য প্রশাসনের সর্বস্তরে ই-গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা করেছে। সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ ভালোভাবেই। নিউজের জন্য এখন আর পরদিনের ছাপা পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। প্রতি মুহূর্তে পত্রিকা-টিভির অনলাইন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে সারা বিশ্বের তাৎক্ষণিক ঘটনাবলি ও তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে। করোনাকালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রযুক্তির ব্যবহারে চরম উৎকর্ষতা দেখাতে পেরেছে আর শিক্ষাব্যবস্থার পুরোটাই প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রেখেই। ব্যবসা-বাণিজ্যও অনলাইনমুখী হচ্ছে। গড়ে উঠেছে এফ-কমার্স বা ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা। এর বাইরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একটি বড় অংশ ফ্রিল্যান্সার। দেশে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। এর বাইরে রয়েছেন সফটওয়্যার খাতের উদ্যোক্তারা। এ খাতে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় আসছে। নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি আরেক বড় অগ্রগতি। এ ছাড়া ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাত দেশে প্রসারিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। এরমধ্যে ১২ হাজার পেজ চালাচ্ছেন নারীরা। ফেসবুককে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে স্বল্প পুঁজিতেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন নারীরা। গত এক বছরে ই-কমার্স খাতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে অন্যতম একটি খাত বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং বা বিপিও। খাতটিতে কাজ করছেন ৩৫ হাজার তরুণ-তরুণী।
অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ প্রযুক্তি ব্যবহারে ত্বরিত সুফলও পেয়েছে। বর্তমানে দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের আয় ১০০ কোটি ডলার। ২০২২ সাল শেষে এ আয় ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নেপথ্য নায়ক ও নিঃশব্দে ঘটে যাওয়া আইসিটি বিপ্লবের স্থপতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। ১২ বছর ধরে দেশের সব মানুষকে ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং সরকারের ডিজিটাল সেবাগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আইসিটি শিল্পে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশকে ডিজিটাল জগতে নিয়ে যাওয়ায় বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি তিনি আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। আমাদের দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বর্তমান ধারা বজায় থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছে যাবে।
ইউডি/সুস্মিত

