খাদ্য হিসেবে চামড়ার বিকল্প ব্যবহার
মাহমুদ হাসান । সোমবার, ১৮ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:২০
বাংলাদেশের মোট চামড়া উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে ঈদুল আজহার সময়। তবে প্রতি বছরই উপযুক্ত দাম ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ চামড়া। কাজেই অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রুখতে, কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সংকট দূর করতে আমরা চামড়াকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। চামড়া আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে প্রচলিত খাবার নয়, তাই প্রথমেই এ প্রশ্নটি উঠবে এটি খাওয়া হালাল কি না এবং ইসলাম এ সম্পর্কে কী বলে? পবিত্র কোরআনে সুরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত এবং শূকরের মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। চামড়া এসব বিষয়গুলোর অন্তভুর্ক্ত নয়। এছাড়া সুরা আন‘আম-এর ১৪৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘জবেহকৃত হালাল পশুর প্রবাহিত রক্ত ব্যতীত সবই হালাল’।
কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য বিষয়ক পরামর্শ সংস্থা এগ্রোভেট বায়ো সলিউশনের কল্যাণে সম্প্রতি ভেটেরিনারি কমিউনিটিতে চামড়াকে প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারটি বেশ লক্ষণীয়। সাধারণত চামড়ার ওজন একটি গরুর মোট ওজনের প্রায় ৭-৭.৫% হয়ে থাকে। অর্থাৎ ১০০ কেজির গরুতে চামড়ার ওজন প্রায় ৭-৭.৫ কেজি। ৩০০ কেজি ওজনের একটা গরু থেকে প্রায় ২১-২২.৫ কেজি চামড়া পাওয়া যাবে। এখন পশম ছাড়িয়ে ড্রেসিংয়ের পর যদি চামড়া থেকে ১৫ কেজি মাংসও পাওয়া যায় এবং সে মাংসের দাম প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হলেও চামড়ার দাম হবে ৬ হাজার টাকা। অথচ একটি চামড়া বিক্রি হচ্ছে ২০-১০০ টাকায় বা নামমাত্র মূল্যে। চামড়ার আয়তন অনুযায়ী একটি ন্যাঘ্যমূল্য নির্ধারণ করে সে টাকা গরিব দুঃখীদের প্রদান করে আমরা নিজেরাই চামড়া প্রসেসিং করার মাধ্যমে তৈরি করতে পারি অতি সুস্বাদু চামড়ার রেসিপি। এভাবে আমরা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে কোরবানির পশুর ভুঁড়ির মতো চামড়ারও অপচয় রোধ করতে পারি। আরব, আফ্রিকার দেশগুলোর পাশাপাশি মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে চামড়া সুস্বাদু খাবার হিসেবে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম সিদ্ধ গরুর চামড়ায় ২২৫ কিলো-ক্যালরি এনার্জি, ৪৭ গ্রাম প্রোটিন, ৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১ গ্রাম ফ্যাট, ০.০২ গ্রাম ফাইবার এবং ৪৫ গ্রাম পানি থাকে।
অন্যদিকে একই পরিমাণ গরুর মাংসে ১৮০ কিলো-ক্যালরি এনার্জি, ২১ গ্রাম প্রোটিন, ১৪ গ্রাম ফ্যাট পাওয়া যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে চামড়ায় চর্বি আছে মাত্র ১%, যেখানে গরুর মাংসে চর্বির পরিমাণ প্রায় ১৪%। গরুর মাংসের মাত্র ২১% প্রোটিন বিপরীতে চামড়ায় প্রোটিন আছে ৪৭%। তবে আমরা কেন চামড়ার পাওয়া এত বিপুল পরিমাণ প্রোটিনের (৪৭%) অপচয় হতে দেব? হাঁস, মুরগি, কবুতরের চামড়া খাওয়া নিয়ে কোনো কথা হয় না, কারণ এগুলো প্রচলিত। আমরা যদি গরুর চামড়াও খাওয়ার প্রচলন করতে পারি তাহলে চামড়া হয়ে উঠবে স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের অন্যতম বিকল্প। এছাড়া আমাদের শরীরের অতি প্রয়োজনীয় আটটি অ্যামাইনো অ্যাসিড পাওয়া যায় গরুর চামড়ার মধ্যে। গরুর চামড়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণ কোলাজেন যা রান্নার পর জেলাটিনে রূপান্তরিত হয়। আমাদের যখন বয়স বাড়তে থাকে তখন এই কোলাজেন তৈরির ক্ষমতা কমতে থাকে যার ফলে আর্থ্রাইটিস, মাংসপেশির দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়তে থাকে যা থেকে চামড়ার কোলাজেন গ্রহণে সহজে মুক্তি মিলতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চামড়া খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। কোলাজেন এবং প্রোটিনের উচ্চমাত্রার কারণে বিশ্বে প্রতিনিয়ত গরুর চামড়া থেকে পাওয়া মাংসের তৈরি খাবারের চাহিদা বেড়ে চলেছে। একেক দেশে একেক নামে চামড়া দিয়ে তৈরি খাবারগুলো জনপ্রিয়। যেমন- মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ায় কিকিল, নাইজেরিয়ার পনমো, আমেরিকায় কেপোমো। চামড়া ভুঁড়ির মতো পরিষ্কার করে ছোট করে কেটে সহজে মাংসের মতো রান্না করে খাওয়া সম্ভব। গরুর চামড়ার প্রোটিন সাধারণত জেলাটিন হিসেবে থাকে। চামড়া থেকে এই জেলাটিন বের করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনীতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই এখন আমাদের চামড়ার ফুড ভ্যালুর কথা ভাবতে হবে। এই প্রোটিনের উৎসটাকে যদি আমরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন শুরু করতে পারি তবে আমরা খুব সহজে চামড়া নিয়ে সংকট দূর করে চামড়া সিন্ডিকেটকে রুখতে পারি।
লেখক: শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউডি/অনিক

